১ নভেম্বর থেকে নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

জাতীয় স্লাইড

আগামী রোববার (১ নভেম্বর) থেকে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন এবং বিগত চার মাসের বকেয়া অর্থ একযোগে পরিশোধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তবে আইবাস++ (iBAS++) সংক্রান্ত কারিগরি সমস্যা এবং মূল বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় অনেক সরকারি চাকরিজীবী এবার এই বর্ধিত সুবিধা ও বকেয়া অর্থ পাচ্ছেন না। যাদের বেতন নির্ধারণ শেষ হয়নি, তাদের আপাতত পুরোনো বেতনকাঠামো অনুযায়ীই চলতি মাসের বেতন প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে তাদের এই প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হলে বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পরিশোধ করা হবে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুধুমাত্র নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, বরং পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা রূপান্তরের ক্ষেত্রেও ব্যাপক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একটি বড় অংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ১ নভেম্বরের মধ্যে সকল চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে একাধিক দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন জানানো হলেও গত সোমবার পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি। ১ নভেম্বরের আগে এই সংকট শতভাগ কাটানো সম্ভব নয় বলেই অর্থ বিভাগ সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির পর গত ৫ অক্টোবর থেকে অনলাইনে বেতন নির্ধারণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কিন্তু নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মূল বেতন নির্ধারণ, গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম রক্ষা, উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা প্রদান এবং বাড়িভাড়া ভাতার হারের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে একাধিক স্পষ্ট অসংগতি উন্মোচিত হয়েছে। তদুপরি, সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (আইবাস++)-এর সার্ভার জটিলতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, প্রজ্ঞাপন তৈরি এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকায় এসব জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হলেও গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অর্থসচিব।

নতুন বেতনকাঠামোর অসংগতির একটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যকার মূল বেতনের ক্রম। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ক্ষেত্রে তা ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। কাগজে-কলমে ১১তম গ্রেড এগিয়ে থাকলেও, নতুন নিয়মে বেতন ধাপ পুনর্নির্ধারণের পর দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী তার ঊর্ধ্বতন ১১তম গ্রেডের কর্মচারী অপেক্ষা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।

একইভাবে পদোন্নতির পর সার্বিক বেতন কমে যাওয়ার এক অদ্ভুত বৈষম্য দেখা দিয়েছে বাড়িভাড়া ভাতার শতকরা হারের কারণে। কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডে একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা হলে ৫০ শতাংশ হারে তিনি বাড়িভাড়া ভাতা পান ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু নবম গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার মূল বেতন বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হলেও বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে ৪৫ শতাংশ (২২ হাজার ৯৫০ টাকা) হয়ে যায়। ফলে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমে যায় ১ হাজার ৯০০ টাকা। চূড়ান্ত ফলাফলে পদোন্নতি সত্ত্বেও ওই কর্মচারীর মোট মাসিক আয় কমে যাচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা।

তাছাড়া, উচ্চতর গ্রেড প্রদানের সময়সীমা এবং যোগ্যতা অর্জনের অস্পষ্ট বিধিমালার কারণে একই পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সমান হয়ে যাওয়ার অথবা জুনিয়রদের বেতন জ্যেষ্ঠদের ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চাকরিজীবীদের অভিযোগ, নিয়মকানুন ও সফটওয়্যারের বৈষম্যের কারণেই বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী আপাতত বর্ধিত সুবিধা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা অতিদ্রুত বাড়িভাড়া ভাতা, গ্রেডের ক্রম এবং উচ্চতর গ্রেডের নিয়মাবলি পুনর্বিবেচনা করে প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, বেতনের এসব বৈষম্য ও অস্পষ্টতা অনতিবিলম্বে নিরসন করা না হলে প্রশাসনে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে যেসব চাকরিজীবীর বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে, প্রশাসনিক জটিলতা সমাধান শেষে ঠিক কবে নাগাদ তারা বর্ধিত বেতন ও চার মাসের বকেয়া টাকা হাতে পাবেন—সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা স্পষ্ট করেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *