দেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার বাড়ানো এবং রাজস্ব আদায়ে গতি ফেরাতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক করদাতা প্রতিবছর রিটার্ন দেওয়া থেকে বিরত থাকায় এখন তাঁদের বাসা ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় সরাসরি চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে অকার্যকর টিআইএন চিহ্নিত করতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সমন্বিত তথ্যভান্ডার ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু এর বিপরীতে বিগত অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৫০ লাখের মতো করদাতা। অর্থাৎ, অন্তত ৮০ লাখ টিআইএনধারী করজালের বাইরেই থেকে গেছেন। এই বিশালসংখ্যক টিআইএনধারীর মধ্যে কতজন মারা গেছেন, কতজনের করযোগ্য আয় নেই কিংবা কতজন ইচ্ছাকৃতভাবে কর দেওয়া এড়িয়ে চলছেন—তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এনবিআরের হাতে নেই। চলতি অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত আদায় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রকৃত করদাতা শনাক্ত করা এবং রিটার্ন জমা না দেওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো খুঁজে বের করা এখন রাজস্ব প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিটি কর অঞ্চল থেকে রিটার্ন জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই কার্যক্রম চালাতে গিয়ে এনবিআর একাধিক বড় জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। দেখা গেছে, করদাতাদের ঠিকানা ভুল কিংবা হালনাগাদ না থাকার কারণে পাঠানো চিঠির প্রায় ৪০ শতাংশই ডাক বিভাগ থেকে ফেরত আসছে। অন্যদিকে চিঠি পাওয়ার পর মাত্র ১০ শতাংশ করদাতা এর জবাব দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত জনবলের তীব্র সংকট থাকায় করদাতাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিঠি পাঠিয়ে বা টিআইএন সংখ্যা বাড়িয়ে করজাল জোরদার করা যাবে না। পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ জানান, করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলের কার্যকারিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সে জন্য মৃত ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার দ্রুত তৈরি করা এবং এনবিআরের নিজস্ব ডাটাবেজ নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, মৃত টিআইএনধারীদের হিসাব পৃথক করাও এনবিআরের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, অনলাইনে সরাসরি কোনো টিআইএন বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করার সুবিধা নেই। একজন করদাতা মারা গেলে তাঁর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীকে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে গিয়ে আবেদন করতে হয়, যা বাস্তবে খুব কমই ঘটে। ফলে বিপুলসংখ্যক মৃত ব্যক্তির নাম খাতাকলমে সক্রিয় টিআইএনধারী হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এ জটিলতা কাটাতে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মৃত ব্যক্তিদের তথ্য এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজের সঙ্গে এনবিআরের টিআইএন তথ্য মেলাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মৃত ব্যক্তিদের পাশাপাশি যেসব জীবিত ব্যক্তির টিআইএন রয়েছে কিন্তু বর্তমানে কোনো করযোগ্য আয় নেই, তাঁদের শনাক্ত করতে কর অঞ্চলগুলোকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগের তথ্য ভুল থাকায় প্রত্যাশিত সাড়া না মেলায় এনবিআর এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে কঠোর প্রয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কার দুই-ই প্রয়োজন। কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মন্তব্য করেছেন, যেসব সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক, সেখানে নিয়মটির শতভাগ কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে রিটার্ন দিতে আগ্রহী করতে আয়কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং যৌক্তিক কর-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
