পাকিস্তানের পর্যটনশিল্প: সম্ভাবনা বনাম অব্যবস্থাপনা

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে পর্যটন খাতের সফলতা পরিমাপ করা হতো আগত পর্যটকের সংখ্যা, হোটেলের কক্ষ দখলের হার এবং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে। তবে আধুনিক বিশ্বে বহু জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এখন অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। অপরিকল্পিতভাবে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ ভূমিতেই বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন, অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। ফলে পর্যটক বাড়লেও স্থানীয় মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার মান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটকের কেবল সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করার দিন শেষ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, পরিবেশের সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা না করলে পর্যটন দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চে সেই পর্যটন গন্তব্যগুলোই সফল হবে, যারা কেবল সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা না করে সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জনগণের জীবনযাত্রার মান সুরক্ষায় জোর দেবে।

পাকিস্তান বর্তমানে এই অপরিকল্পিত পর্যটনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দেশটিতে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকরী ব্যবস্থার অভাবে খাতটি সংকটে পড়েছে। ঈদের ছুটি কিংবা বিভিন্ন সরকারি বন্ধের দিনগুলোতে পাকিস্তানের জনপ্রিয় পার্বত্য ও ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে তীব্র যানজট, যেখানে-সেখানে আবর্জনা এবং মৌলিক সেবার চরম সংকট তৈরি হয়। এতে একদিকে যেমন ভ্রমণকারীদের ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট হয়, অন্যদিকে স্থানীয় অধিবাসীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।

সমস্যাটি মূলত ভিড় নিয়ে নয়, সমস্যা হলো সেই ভিড় সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও সঠিক আচরণবিধির অভাবে কেন্দ্রগুলোতে উচ্চস্বরে গান বাজানো, বেপরোয়া আচরণ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।

পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত প্রভাবের কারণেও পর্যটনের মূল সত্তা বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক দর্শনার্থী কোনো স্থান ও তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেয়ে কেবল ছবি তুলে তা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করতেই বেশি ব্যাকুল। ফলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছবি তোলার সস্তা পটভূমিতে পরিণত হচ্ছে, আর হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান। পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, দক্ষ জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার এই অভাব পর্যটন শিল্পের সুনাম নষ্ট করছে।

যখন বাস্তবতার সাথে মৌখিক প্রচারণার বড় ব্যবধান থাকে, তখন দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান, স্থানীয় মানুষ নিজেদের শোষিত মনে করেন এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের আশাও গুঁড়িয়ে যায়। ফলে একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা তার সৌন্দর্যের বদলে বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।

প্রকৃত পর্যটন খাতের সাফল্য লুকিয়ে থাকে স্টেকহোল্ডার বা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য সুফল নিশ্চিত করার মধ্যে। একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ, শিক্ষণীয় ও সম্মানজনক পরিবেশ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দরকার সম্মানজনক আয়ের উৎস, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ততা এবং তাদের সংস্কৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দরকার মৌসুমি ভিড়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সারা বছরব্যাপী একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো।

দশ লাখ পর্যটক এসে যদি স্থানীয় অর্থনীতিতে ন্যূনতম অবদান না রাখেন, রীতিনীতি ভঙ্গ করেন এবং কাঠামোগত ক্ষতি করেন, তবে তাদের চেয়ে কমসংখ্যক সেই দায়িত্বশীল পর্যটকেরা অনেক বেশি মূল্যবান, যারা দীর্ঘ সময় থাকেন, স্থানীয়দের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করেন।

পাকিস্তানকে তাই কেবল আকর্ষণীয় স্লোগানের ওপর ভরসা না করে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, দক্ষ পেশাজীবী তৈরি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বিনিয়োগ করা জরুরি। শুধু ছুটি কেন্দ্রিক সাময়িক বিশৃঙ্খলা সামলানোর বদলে সারা বছরের জন্য টেকসই পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

ড. শাব্বির আব্বাস নাকভি—যিনি সিন্ধু নদীর বিবর্তন বিষয়ক প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজির পাশাপাশি পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় পিএইচডি করেছেন—তাঁর মতে, অসংগঠিত পর্যটন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। প্রচলিত এই ধারা পরিবর্তন করে যদি স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় এবং দক্ষ পর্যটন কর্মী গড়ে তোলা যায়, তবেই পাকিস্তানের পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী ও টেকসই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *