সামুদ্রিক মৎস্য খাতে সংকট: পাঁচ বছরে আহরণ কমেছে সাড়ে ১৬.৫৭ শতাংশ

অর্থনীতি স্লাইড

বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির অন্যতম প্রাণশক্তি সামুদ্রিক মৎস্য খাত এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, অতিরিক্ত মৎস্য শিকার, উপকূলীয় দূষণ এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ আহরণ প্রায় ১৬ point ৫৭ শতাংশ কমে গেছে। সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের নানা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের ওপর চাপ দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

দেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতের এই নিম্নগতির পেছনে একাধিক জটিল ও সমন্বিত কারণ বিদ্যমান। মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক শাখার বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক মাছের প্রাকৃতিক সংস্থান বা মজুতের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে মাছের পুনরুৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের দেশের মৎস্যজীবীদের একটি বড় অংশ এখনো সনাতন ও প্রথাগত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। গভীর সমুদ্রে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে উন্নত মানের সরঞ্জাম ও ট্রলার ব্যবহার করে মাছ ধরার সামর্থ্য ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা আমাদের এখনো বেশ সীমিত।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত দূষণ, সামুদ্রিক পরিবেশের মারাত্মক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সীমানা ঘেঁষে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপায়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ শিকারের প্রবণতা।

মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে প্রথাগত বা ক্ষুদ্র নৌযান এবং শিল্পভিত্তিক ট্রলারগুলোর মাছ আহরণের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  • ক্ষুদ্র ও প্রথাগত নৌযান: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথাগত ও ক্ষুদ্র নৌযানের মাধ্যমে মাছ আহরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ টন। তবে পরবর্তী অর্থবছরেই (২০২৪-২৫) তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫১ হাজার ৬৬১ টনে।
  • শিল্পভিত্তিক বাণিজ্যিক ট্রলার: অন্যদিকে, শিল্পভিত্তিক ট্রলারগুলোর মাধ্যমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ করা হয়েছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টন মাছ, যা পরের অর্থবছরে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫১ টনে উন্নীত হয়েছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিক ও শিল্পভিত্তিক ট্রলারগুলোর জন্য সমুদ্রের নির্দিষ্ট গভীর অঞ্চল নির্ধারিত থাকলেও তারা প্রায়শই আইন অমান্য করে উপকূলের কাছাকাছি বা অগভীর পানিতে এসে মাছ শিকার করছে। এর ফলে একদিকে উপকূলীয় সাধারণ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরা মাছ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে অগভীর পানির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। এতে সাধারণ ডিঙ্গি নৌকা বা ছোট ট্রলারের সঙ্গে বিশাল শিল্পভিত্তিক ট্রলারগুলোর একটি অসমান ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

টেকসই উপায়ে সামুদ্রিক মাছ আহরণ নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত হলো নিখুঁত ডেটা বা প্রজাতিভিত্তিক মৎস্য মজুতের নির্ভরযোগ্য হিসাব রাখা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে নির্দিষ্ট প্রজাতি অনুযায়ী সমুদ্রের কোন স্তরে কত পরিমাণ মাছের মজুত রয়েছে—তার কোনো আন্তর্জাতিক মানের বা সুনির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার নেই।

প্রজাতিভিত্তিক নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় সামুদ্রিক পরিবেশের ক্ষতি না করে ঠিক কতটুকু মাছ নিরাপদে আহরণ করা সম্ভব (Maximum Sustainable Yield), তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বহুল চাহিদাপূর্ণ টুনা বা অন্যান্য মূল্যবান বাণিজ্যিক মাছের উপস্থিতি সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের অভাবে আমরা গভীর সমুদ্রের এই অপার সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানীদের অভিমত অনুযায়ী, আমাদের সমুদ্র উপকূলে মাছ অবতরণ ও আহরণসংক্রান্ত সমন্বিত তথ্য সংগ্রহের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। এর পাশাপাশি অসচেতনভাবে সমুদ্রে ফেলে আসা কারেন্ট জাল বা পরিত্যক্ত ‘ফ্যান্টম নেট’, রাসায়নিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত জলযান চলাচলের ফলে সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশে ক্ষতিকর জালের ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে অজস্র অণুজীব ও ছোট মাছ।

এই সমস্ত সামগ্রিক সংকটের কারণে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে সামুদ্রিক মাছের সার্বিক অবদান ক্রমেই তলানিতে গিয়ে ঠেকছে:

  • ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছর: দেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ২১.৮৮ শতাংশ আসত সমুদ্র থেকে।
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: চার দশকের ব্যবধানে এই অবদান প্রায় অর্ধেকে নেমে মাত্র ১১.১২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কাটাতে হলে অবিলম্বে বঙ্গোপসাগরে কোন ট্রলার কোথায় এবং কী উপায়ে মাছ ধরছে তা নজরদারির আওতায় আনতে স্যাটেলাইট বা জিপিএস ট্র্যাকিং প্রযুক্তি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রথাগত জেলেদের আধুনিকায়ন, গভীর সমুদ্র থেকে টুনাজাতীয় মাছ আহরণের জন্য আধুনিক ভেসেল সংযোজন এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে সমন্বিত ও ডিজিটাল ডেটা সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা ও অবৈধ মৎস্য শিকার বন্ধ না করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রোটিন নিরাপত্তার ওপর আরও বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *