বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের জাপানি বিনিয়োগের বড় উদ্যোগ

জাতীয় স্লাইড

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ ও শিল্প কাঠামোর উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার একটি মেগা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জাপান। জাপানের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ‘নিক্kei এশিয়া’ (Nikkei Asia)-র প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এই বৈপ্লবিক বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের টোকিও সফরকে কেন্দ্র করে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য সামনে আসে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরটি দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীর্ষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি বা সমঝোতা আসার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী, দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত বিশেষ মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন।

এই সফরে প্রধানত যেসব খাতে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ জোরদার করা হচ্ছে:

  • গাড়ি ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প: বাংলাদেশে অটোমোবাইল সংযোজন ও তৈরির পাশাপাশি আধুনিক উৎপাদনশিল্পের বিকাশ।
  • জ্বালানি অবকাঠামো: টেকসই বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
  • বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ): আড়াইহাজারসহ দেশের নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন।

জাপানি বাণিজ্য সংস্থা ‘সুমিতোমো করপোরেশন’ (Sumitomo Corporation)-সহ বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সার্বিক উন্নয়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এই বিশেষ অঞ্চলগুলোতে জাপানিদের অংশগ্রহণ বাড়লে বাংলাদেশের শিল্পখাতে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে।

চারদিনের এই ঝটিকা সফরে কূটনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি জাপানের শীর্ষ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর সাথে টানা ধারাবাহিক সভার সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের শীর্ষ উন্নয়ন ও বাণিজ্য সংস্থাগুলো—যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (JBIC) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (JETRO)-এর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন।

এছাড়া, জাপানের বহুজাতিক বাণিজ্যিক জায়ান্ট মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি (Mitsui & Co.), সুমিতোমো করপোরেশন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় কোম্পানি ‘জেরা’ (JERA)-এর নীতিনির্ধারকদের সাথে কৌশলগত বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

সফরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে: ১. বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম: টোকিওতে আয়োজিত এই ফোরামে প্রধান অতিথি হিসেবে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত থাকবেন। ২. ইউনিক্লো (Uniqlo) সদর দপ্তর পরিদর্শন: বৈশ্বিক তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর মূল কার্যালয় সফর করে প্রতিষ্ঠানটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলবেন। ৩. টয়োটা মোটর কারখানা ভ্রমণ: সফরের শেষ দিনে নাগোয়া শহরে অবস্থিত অটোমোবাইল শিল্পের বিশ্বখ্যাত জায়ান্ট ‘টয়োটা মোটর করপোরেশন’-এর ঐতিহাসিক মোটোমাচি কারখানা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক সম্প্রসারণে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (Economic Partnership Agreement – EPA) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির সফল বাস্তবায়ন, জাপানের বিশাল ও সমৃদ্ধ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সহজ ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যবসায়িক সেতুবন্ধন দৃঢ় করাই এই সফরের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত এই ৬৩৫ কোটি ডলারের জাপানি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ভারী শিল্প, অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত পণ্যের বহুমুখীকরণ ঘটবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (Global Supply Chain) দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *