বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে এবং করদাতার সংখ্যা বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় সোয়া কোটি মানুষ কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) গ্রহণ করলেও, এর একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ লাখ করদাতাই নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন না। আইন অনুযায়ী সবার জন্য রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও, করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও যারা রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠোর আইনি শাস্তি ও নানামুখী প্রশাসনিক জটিলতা। সম্প্রতি এনবিআর আয়কর আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ঘোষণা দেওয়ায় রিটার্ন না দেওয়ার খেসারত দিতে হতে পারে বিভিন্ন স্তরের নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের।
সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত থাকে যে, টিআইএন থাকলেই তাকে প্রতিবছর বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে। মূলত, আইন অনুযায়ী সবার জন্য রিটার্ন জমা দেওয়া আবশ্যক নয়। যাদের বার্ষিক আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার নিচে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে করযোগ্য আয় থাকলে তা দেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। এছাড়া দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ ধরনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা স্লিপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে দৈনন্দিন নাগরিক জীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখতে রিটার্ন দাখিলের বিকল্প নেই।
আইনগত বাধ্যবাধকতা অমান্য করে যারা নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন না, তাদের মূলত পাঁচ ধরনের গুরুতর আইনি ও আর্থিক ঝামেলার মুখোমুখি হতে হবে। নিচে বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আর্থিক জরিমানা ও অতিরিক্ত দণ্ড: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে নতুন আয়কর আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী কর কর্মকর্তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। এই ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলের ব্যর্থতার কারণে করদাতার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা ধার্য করা হতে পারে। এই জরিমানার পরিমাণ সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, যদি এই ব্যর্থতা বা অবহেলা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা করে জরিমানা গুনতে হতে পারে। পাশাপাশি, কোনো বিশেষ তদন্তের সময় কর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আয়কর সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হলে এবং তা প্রদানে ব্যর্থ হলে সমপরিমাণ অর্থাৎ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
২. কর অব্যাহতি বা ছাড় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া: নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতারা সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন কর অব্যাহতির আকর্ষণীয় সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন। নতুন আয়কর আইনের ১৭৪ ধারা অনুযায়ী কর অব্যাহতির ক্ষেত্রগুলো বেশ সংকুচিত করা হয়েছে। সাধারণ সময়ে একজন নাগরিক সঞ্চয়পত্র কেনাসহ সরকার নির্ধারিত বিভিন্ন লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত বা ছাড় পেয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তিনি সময়মতো রিটার্ন জমা না দেন, তবে তিনি আর এই ধরনের কোনো কর ছাড় বা সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন না, যা তার বিনিয়োগের লাভের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৩. প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে কর আরোপ: শুধু এককালীন জরিমানাই নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে করদাতাদের নিয়মিত করের অতিরিক্ত বোঝাও বহন করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, সময়মতো রিটার্ন জমা না দেওয়া হলে প্রতি মাসের জন্য নির্ধারিত বা আরোপিত করের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে সরল সুদ বা অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে সময়ের ব্যবধানে ঋণ বা বকেয়ার পরিমাণ হু হু করে বাড়তে থাকবে।
৪. গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো জরুরি ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন: কর ফাঁকি রোধ ও রিটার্ন জমা প্রদানে বাধ্য করতে এবার সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো অতিপ্রয়োজনীয় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সময়মতো আয়কর রিটার্ন না দিলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির বা প্রতিষ্ঠানের গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ কেটে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কর কর্মকর্তাদের। শুধু আবাসিক ভবন বা বাসা-বাড়িই নয়, দেশের বড় বড় শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা যদি তাঁদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের নামে সঠিক সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দেন, তবে তাঁদের কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। এমনকি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি পানি কিংবা অন্যান্য যেকোনো রাষ্ট্রীয় ও সরকারি পরিষেবার সংযোগও এই ব্যবস্থার আওতায় বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
৫. চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ও জটিলতা: সরকারি ও বেসরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রেও রিটার্ন না দেওয়ার ফল অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে উচ্চ গ্রেডের (প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা) কর্মকর্তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে আয়কর রিটার্ন দেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের মাসিক বেতন-ভাতা উত্তোলনের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অফিস থেকে রিটার্ন জমার কপি বা প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলকভাবে চাওয়া হয়; আর তা জমা দিতে ব্যর্থ হলে বেতন আটকে রাখা কিংবা বেতন থেকে নির্দিষ্ট অংশ কেটে রাখার ঘোষণা পর্যন্ত দেওয়া হয়ে থাকে। বেসরকারি খাতের বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম কঠোর নিয়ম বা নীতিমালা বলবৎ রয়েছে।
করদাতাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এবং কর ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি অর্থবছর থেকে বছরজুড়েই রিটার্ন দেওয়ার যুগান্তকারী সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে বিশেষ কর ছাড় বা সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এরপর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে যারা রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের ওপর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যে কর নির্ধারিত হবে, ঠিক তা–ই পরিশোধ করতে হবে। তবে আপনি যদি জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে কখনো রিটার্ন দাখিল করেন, তবে নির্ধারিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত জরিমানা এবং শাস্তিমূলক বিধানের মুখোমুখি হতে হবে। সংগত কারণেই অর্থবছর শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই কিংবা নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন সম্পন্ন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, অন্যথায় নানা ধরনের অনভিপ্রেত আইনি ঝামেলা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
