বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে একযোগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাসমূহ—একদিকে উচ্চ সুদের ঋণের চাপে পিষ্ট নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণের দাবি, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনে সাইবার হামলার বিশেষ সতর্কতা। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের যৌথ বার্ষিক সম্মেলনে বৈশ্বিক এই রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, চড়া সুদের হারের কারণে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশগুলোর রাজস্বের প্রায় ১৪ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ ও মূলধন মেটাতে, যা আগে ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। এই রাজস্ব সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো জরুরি খাতগুলো।
বার্ষিক সম্মেলনের বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ প্রধান যেসব বিষয়ের ওপর জোর দেন:
দ্রুত ঋণ পুনর্গঠন: ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ঋণ দ্রুত শিথিল ও পুনর্গঠন করতে হবে।
রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়: বৈষম্যহীন রাজস্ব নীতি এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্র নির্ধারণ।
প্রযুক্তি ও প্রবৃদ্ধি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গ্রহণ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সহজ অর্থায়ন: দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকটে থাকা দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বেসরকারি খাত থেকে নমনীয় বা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুব্যবস্থা করা।
আইএমএফের ‘ফিউচার অব ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট’ অধিবেশনে মূল আলোচনার বিষয় ছিল ব্যাংকবহির্ভূত লেনদেন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর দিকগুলো। গ্রিস ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু এবং আইএমএফ উপপরিচালক মিকেলা এরবেনোভা স্পষ্ট করে জানান, বিশ্বজুড়ে ক্যাশলেস বা অনলাইন লেনদেন বাড়ায় সাইবার অ্যাটাকের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়েছে। এআই ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক অপরাধীরা নতুন হুমকি তৈরি করছে।
আইএমএফের সুপারিশ অনুযায়ী, যেকোনো দেশ ডিজিটাল অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাইলে কেবল বৈশ্বিক নির্দেশিকা মানলেই চলবে না, নিজস্ব অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
সম্মেলনে বৈশ্বিক সংহতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মঙ্গোলিয়া। বিশ্বব্যাংকের ৭৮টি স্বল্প আয়ের অনুদানপ্রার্থী দেশের সহায়তায় গঠিত আইডিএ (IDA) তহবিলে ১৩ লাখ মার্কিন ডলার (৪৮০ কোটি তুগরিক) প্রদান করে দাতাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছে দেশটি।
একদা দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করা মঙ্গোলিয়া ১৯৯১ সাল থেকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে শিক্ষা, চিকিৎসা ও গ্রামীণ উন্নয়নে ১৬২ কোটি ডলার বিশ্বব্যাংক থেকে সাহায্য পেয়েছিল। কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের পর ২০২০ সালে তারা নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা ছাড়িয়ে উচ্চ স্তরের ‘আইবিআরডি’ গ্রাহক শ্রেণীতে উন্নীত হয়।
আজ সেই মঙ্গোলিয়া নিজেই আইডিএর দাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এটিকে আন্তর্জাতিক সংহতি ও সফল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য উদাহরণ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিসা ফিনেরান। মঙ্গোলিয়ার অর্থমন্ত্রী মেন্দসাইখান জাগদজাভ আশা প্রকাশ করেন, সহজ শর্তের এই সহায়তা অন্যান্য অনগ্রসর দেশকে অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় সাহায্য করবে।
