দুর্গাপূজার আনন্দের জোয়ার মুহূর্তেই রক্তিম বিষাদ ও শোকে রূপ নিয়েছে কলকাতার একটি জনপ্রিয় পূজামণ্ডপে। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়, বৃষ্টি ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটেছে। এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন দর্শনার্থীর প্রাণহানির মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়া গেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
আনন্দমুখর উৎসবের আবহাওয়াকে নিমিষেই গ্রাস করে নিয়েছে কান্নার রোল ও আতঙ্ক। শুক্রবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় গোটা পশ্চিমবঙ্গে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপে সাধারণ দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ করে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হলে মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে থাকা মানুষেরা হুড়োহুড়ি করে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। মণ্ডপের প্রবেশ ও বের হওয়ার সংকীর্ণ পথে একসঙ্গে বহু মানুষ জড়ো হওয়ায় প্রচণ্ড ভিড়ের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন পেছন দিক থেকে আসা প্রবল ধাক্কায় সামনের সারিতে থাকা নারী ও শিশুরা ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাদের ওপর একের পর এক মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ায় নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার মতো বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের প্রাথমিক চেষ্টাগুলোও ভিড়ের চাপে ব্যর্থ হতে বসেছিল।
এক প্রত্যক্ষদর্শী যুবতী জানান, তিনি তার তিন বান্ধবীকে নিয়ে মণ্ডপ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বাইরে বৃষ্টি থাকায় অনেকেই মণ্ডপের মুখে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছনের দিক থেকে তীব্র ধাক্কা আসে। চোখের পলকে সামনের লোকজন পড়ে গেলে তাদের ওপর অন্যরা স্তূপাকারে পড়তে থাকেন। ওই তরুণীর তিন বান্ধবীও সেই ভিড়ের নিচে চাপা পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় সাহসি যুবকেরা মণ্ডপের কাঠামোর একটি অংশ ভেঙে তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা চালান।
দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আহত ও নিথর দেহ নিয়ে আসার পর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চরম ব্যস্ততা শুরু হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
ছুটির মেজাজ ও উৎসবের আমেজ থাকা সত্ত্বেও জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। খবর পেয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও দ্রুত পরিস্থিতি পরিদর্শনে হাসপাতালে ছুটে যান।
দুর্ঘটনার পর পরই চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজার মতো জনবহুল উৎসবে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জরুরি নির্গমনপথ খোলা রাখা এবং পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক বা পুলিশ মোতায়েন নিয়ে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল কি না এবং মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকরা ভিড় নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
