ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ সত্ত্বেও কমছে রাজস্ব আদায়

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) আইনগত হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা থাকলেও অর্থনীতির সার্বিক আকারের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৬ point ৭ শতাংশে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক প্রাক্কলনে সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ point ৮ শতাংশে। বিশ্বব্যাংক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্যমতে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে এই কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্নের তালিকায় অবস্থান করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব সংগ্রহের এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে ঢালাও করছাড়, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বিশাল পরিধি, জটিল করকাঠামো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রশাসনিক সক্ষমতার মারাত্মক অভাব।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান

ওইসিডির ‘রেভিনিউ স্ট্যাস্টিক্স ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক ২০২৬’ শীর্ষ প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০২৪ সালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ point ৭ শতাংশ এবং ওইসিডিভুক্ত সমৃদ্ধ দেশগুলোতে তা ৩৪ point ১ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের হার আঞ্চলিক গড়ের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়:

জাপান: ৩৩ point ৭ শতাংশ (অঞ্চলে সর্বোচ্চ)

নেপাল: ১৬ শতাংশের বেশি

ভুটান: ১৩ শতাংশের বেশি

ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা: গড়ে ১২ শতাংশের বেশি

বাংলাদেশ: মাত্র ৬ point ৭ শতাংশ

ঐতিহাসিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে এই অনুপাত ছিল ৫ point ৪ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে বেড়ে সর্বোচ্চ ৭ point ৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে ২০২০ সালের পর থেকে এটি ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে ঠেকেছে।

কেন কাজ করছে না ১৫ শতাংশ ভ্যাট?

সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে এবং ৩১ শতাংশ আসে আয়কর ও করপোরেট কর থেকে। স্বাভাবিকভাবেই ভ্যাট আদায়ের দক্ষতার সঙ্গে দেশের মোট রাজস্ব বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার থাকলেও কার্যকর করের ভিত্তি অত্যন্ত সংকুচিত।

বিভিন্ন খাতে বিশেষ অব্যাহতি, হ্রাসকৃত হার প্রয়োগ এবং কর বিরতির কারণে আইনগত হার ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ওইসিডির ‘ভ্যাট-রেভিনিউ রেশিও’ (ভিআরআর) সূচকে বাংলাদেশের মান মাত্র ০ point ৩ (গড় ভ্যাট ১৮ শতাংশ ধরে)। এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য মোট ভ্যাটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। অথচ সমমানের ভ্যাট হার থাকা সত্ত্বেও আজারবাইজান ও জর্জিয়ার ভিআরআর সূচক যথাক্রমে ০ point ৬ এবং ০ point ৭৫।

অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর ফাঁকির চিত্র

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ করছাড় দেওয়া হয়, তার মোট আর্থিক মান সরকারের মোট সংগৃহীত করের প্রায় কাছাকাছি (২০২১-২২ অর্থবছরে যা ছিল জিডিপির ৬ point ৯ শতাংশ)।

এছাড়া দেশের একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিকভাবে নগদ লেনদেনের (ক্যাশ ট্রানজাকশন) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভ্যাট ফাঁকি বা ভ্যাট ঘাটতির পরিমাণ সম্ভাব্য মোট রাজস্বের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। জাল চালান, বিক্রির তথ্য গোপন করা, অনিবন্ধিত ব্যবসা এবং অন্যায়ভাবে ইনপুট কর সমন্বয়ের কারণে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র।

আইএমএফের শর্ত ও এনবিআরের সংস্কার

রাজস্ব সংগ্রহের আন্তর্জাতিক এই সূচকে অবনতির কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কঠোর শর্ত দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে।

এই সুপারিশগুলোর ওপর ভিত্তি করে সরকার এনবিআরকে পুনর্গঠন করে নীতি প্রণয়ন বিভাগ ও কর আদায় বিভাগ পৃথক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে ডিজিটাল ই-চালান, অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা এবং ডেটাবেজ ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর প্রভাব বিবেচনা করে সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে এগোলে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই রাজস্ব বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *