জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বহিরাগতদের আনাগোনা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির গাম্ভীর্য বিবেচনা করে এবং রাজস্ব ভবনের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশের সর্বোচ্চ কর আদায়কারী এ সংস্থাটি।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এনবিআরের বিশাল আধুনিক প্রধান কার্যালয় রাজস্ব ভবনে এনবিআরের মূল প্রশাসনিক শাখার পাশাপাশি একাধিক অতিসংবেদনশীল দপ্তর ও ইউনিট পরিচালিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেশের কর ফাঁকি ও আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধানের প্রধান দপ্তর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)-এর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) এবং করসংক্রান্ত প্রশাসনিক আপিল বিভাগ। প্রতিদিন এসব দপ্তরে শত শত গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং বিপুল অঙ্কের রাজস্বসংক্রান্ত স্পর্শকাতর ফাইলপত্র লেনদেন হয়। ফলে বহিরাগত ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সম্প্রতি দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এনবিআরের উচ্চপর্যায়েও রদবদল ঘটে। কাস্টমস ও কর ক্যাডারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা আহসান হাবিবকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শীর্ষপদে এই পরিবর্তনের পরপরই এক শ্রেণির মানুষ নানা ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এনবিআর ভবনে ধারাবাহিকভাবে যাতায়াত শুরু করেন। নতুন চেয়ারম্যানকে শুভেচ্ছা জানাতে প্রতিদিন বিভিন্ন মহল ও রাজনৈতিক পরিচয়ে আসা লোকজনের ভিড় জমতে থাকে।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নেন আহসান হাবিব। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ফুল ও সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা তিনি গ্রহণ করবেন না। এমনকি এনবিআরের বিভিন্ন ব্যাচভিত্তিক কর্মকর্তারা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে আসা শুরু করেন, তখন তাও নিরুৎসাহিত করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা জোরদারে এনবিআর নির্দেশ দেয় যে অফিসের নির্ধারিত সময়ে অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজের কর্মস্থল বা কক্ষ ত্যাগ করতে পারবেন না।
এতসব কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয়ে আসা বহিরাগতদের আনাগোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। ভবনের নিরাপত্তা ডেস্কে কর্মরত নিরাপত্তারক্ষীদের পক্ষে সাধারণ দর্শনার্থী, রাজনৈতিক পরিচয়ে আসা ব্যক্তি এবং নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আলাদা করে শনাক্ত করা প্রতিনিয়ত কঠিন হয়ে পড়ছিল। অনেকেই রাজনৈতিক প্রভাব বা বেশভূষার আড়ালে নিরাপত্তা কর্মীদের দৃষ্টি এড়িয়ে ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রবেশ করছিলেন।
এই জটিল ও শঙ্কাজনক পরিস্থিতি নিরসনে সোমবার এনবিআরের পক্ষ থেকে একজরুরি নোটিস জারি করা হয়। নোটিসে উল্লেখ করা হয় যে, এনবিআর এবং এই ভবনে অবস্থিত অন্যান্য অঙ্গ-দপ্তরে কর্মরত সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজ নিজ দাপ্তরিক পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) প্রদর্শন ও ব্যবহার করে ভবনে প্রবেশ করতে হবে। পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখা বা যাচাই নিশ্চিত করা ছাড়া কাউকে ভবনের মূল গেট অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে এনবিআর ভবনে যেকোনো দর্শনার্থী বা বহিরাগত ব্যক্তির প্রবেশের ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ দর্শানো এবং পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে রাজস্ব ভবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং প্রশাসনিক কাজে স্বাভাবিক গতি ও স্থায়িত্ব ফিরবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
