মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের অঙ্গীকার করার প্রায় ছয় মাস পরও সংঘাতের কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি অনেকটাই অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। সামরিক বিজয় কিংবা আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এই অবস্থায় অচলাবস্থা ভাঙতে নতুন কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে এমন যেকোনো দেশের ওপর ‘ভয়াবহ’ অর্থনৈতিক পরিণতি চাপিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে নতুন এই অর্থনৈতিক চাপ কীভাবে কার্যকর করা হবে, তার বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী ২৪ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা বলেছেন। তবে সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে সহায়তা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে-এমন যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন, তারা বন্ধু হোক বা শত্রু।
বেসেন্ট বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের পক্ষে, নয়তো বিপক্ষে। যদি আপনি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার ব্যাপারে জেদ করেন-সেটা অর্থ স্থানান্তর, তাদের তেল কেনা কিংবা সমুদ্রপথে অর্থ লেনদেন যাই হোক-তাহলে মার্কিন ট্রেজারি ও সরকার আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের পূর্ণ শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলোকে সংঘাতের একটি ‘নতুন পর্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক চাপই যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ‘সবচেয়ে কার্যকর’ হাতিয়ার।
ক্লে ট্র্যাভিস ও বাক সেক্সটন শো-তে ভ্যান্স বলেন, ‘তারা আমাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে যা সত্যি হয়েছে, তা হলো আমাদের চেয়ে তারাই অনেক বেশি চাপ অনুভব করেছে। আমরা এটা চালিয়ে যাব, কারণ আমরা মনে করি চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটাই সর্বোত্তম উপায়।’
দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান
১৯৭৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইরান উল্লেখযোগ্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তি ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া পারমাণবিক চুক্তি-জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার পর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার হয়।
বর্তমান সংঘাতেও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর আর্থিক প্রবাহের ওপর মার্কিন ট্রেজারি-সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ রয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির আটলান্টিক কাউন্সিলের ভূ-কৌশল বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক নীতি উপদেষ্টা ইমরান বায়োমি বিবিসিকে বলেছেন, ‘ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা সম্ভবত অন্যান্য কৌশল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার হতাশারই প্রতিফলন। এটি আসলে এই স্বীকৃতি যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে প্রায় আটকে পড়েছে। এটি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের আরেকটি প্রচেষ্টা।’
বায়োমি বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আরেকটি কৌশল মাত্র। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামরিক বা অর্থনৈতিক কোনো কৌশলের সুস্পষ্ট রূপরেখা দেখিনি। যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করতে চাইছে, সেই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।’
তৃতীয় দেশগুলোও নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হতে পারে
অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোলের (ওফ্যাক) আট বছরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ মাইকেল পার্কার মনে করেন, নতুন কৌশলের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার ‘অর্থনৈতিক প্রভাবের পরিধি প্রসারিত’ করার চেষ্টা করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে এখনো ব্যবসা করা তৃতীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল, তারা নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
পার্কার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞা নীতি মেনে চলতে উৎসাহিত করার জন্য গৌণ নিষেধাজ্ঞার হুমকি ব্যবহার করেছে। কিন্তু মার্কিন ডলার ও ইরান উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো কিছুকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে এটি এমন একটি উপায়, যা এখনো অনাবিষ্কৃত।’
বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যারা ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করে বা ইরানের কোষাগারে অর্থ পাঠায়, তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে জানান পার্কার।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অভ্যস্ত ইরান
নতুন মার্কিন পদক্ষেপের জবাবে ইরান কী করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন অনিয়মিত পথ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যে রয়েছে তেল পরিবহনে ‘ছায়া’ জাহাজ ব্যবহার এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই এমন নতুন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে লেনদেন করা। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হাম্মুদা বলেন, ‘আপনি ক্রমাগত নতুন নতুন নাম উঠে আসতে দেখছেন, কারণ ইরান খুব দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। যে কোনো নিষেধাজ্ঞাই আরোপ করা হোক না কেন, তারা তা এড়ানোর জন্য নতুন পথ খুঁজে নেয়।’
তিনি বলেন, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপগুলো প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন করে তোলে।
হাম্মুদা বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাগুলো সবই কাগজে-কলমে, কিন্তু আসল কঠিন কাজটা হয় পর্দার আড়ালে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন দল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে এবং জড়িত পক্ষগুলোকে শনাক্ত করতে কাজ করছে। এ কারণেই ইরানকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
চীন-তুরস্ক-ইরাকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
নতুন নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। এসব দেশের মধ্যে চীনের পাশাপাশি তুরস্ক ও ইরাকের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও থাকতে পারে।
পার্কার বলেন, ‘এর কিছু বিষয় ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা অনেকাংশেই অন্যান্য দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দেয়ার সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।’
তার মতে, নিষেধাজ্ঞা ততটাই কার্যকর, যতটা লক্ষ্যবস্তু দেশগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য মেনে চলতে ইচ্ছুক। অন্যথায় এসব দেশ মার্কিন ডলার-সম্পর্কিত বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
তবে এই সদিচ্ছা আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। বায়োমি বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ, চীন এতে রাজি হবে বলে আমার মনে হয় না। এই রাষ্ট্রগুলো সবাই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। মূল কথা হলো, এটি কেবল আরেকটি হাতিয়ার। কিন্তু কৌশলের বৃহত্তর প্রশ্নটি থেকেই যায়। সেটি না থাকলে, আমি নিশ্চিত নই যে এটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো পরিবর্তন আনবে।’
