সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে তোড়জোড়

জাতীয় স্পেশাল

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। চলছে বহুমুখী আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা।

তাঁকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চূড়ান্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তদন্তসংশ্লিষ্ট দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, বেনজীরকে ফেরত আনার অনুরোধপত্র তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। সেটি স্বরাষ্ট্র  মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা আরব আমিরাত সরকারের কাছে পৌঁছানো হবে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

দীর্ঘ আত্মগোপনের পর গত ১২ জুন দুবাইয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন বিতর্কিত এই সাবেক পুলিশ প্রধান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রবিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আরব আমিরাত সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানিয়েছে।

আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠাতে হবে, অন্যথায় তাঁকে আটকে রাখা জটিল হয়ে পড়বে।

বেনজীর আহমেদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর গ্রেপ্তার নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং ১২ জুন একটি শপিং মল থেকে তাঁকে আটক করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের একজন সংসদ সদস্য, যিনি বেনজীরের বন্ধু ও ব্যাবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচিত, তিনি তাঁকে ওই শপিং মলে দেখা করতে ডেকেছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।

সাবেক এই দাপুটে আইজিপি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর অনুসারী ও সুবিধাভোগীরা ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে। বিশেষ করে যাঁরা তাঁর দুর্নীতির অংশীদার হিসেবে পরিচিত, তাঁরা অনলাইনে প্রচার করছে যে বেনজীর আহমেদকে আদৌ গ্রেপ্তার করা হয়নি অথবা আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আরব আমিরাতের গণমাধ্যম ‘খালিজ টাইমস’ ও ‘গালফ নিউজ’ তাঁর গ্রেপ্তারের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, দুর্নীতি করে কামাই করা টাকা তাঁর বাহিনীকে দিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে যে তিনি গ্রেপ্তার হননি, যেগুলো সবই মিথ্যা। তিনি বলেন, বেনজীরের দুর্নীতির টাকা কার কার মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো তদন্ত করে বের করা দরকার। যারা বেনজীরকে সহযোগিতা করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে পারলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি গুরুতর দুর্নীতি ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি চার লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় এরই মধ্যে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। র‌্যাব ও পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে থেকেও নিজেকে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ কর্মী পরিচয়ে পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে যথাক্রমে আট কোটি ৭৫ লাখ ও পাঁচ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা রয়েছে। এসব মামলায় বেনজীর আহমেদকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।

বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আলোচনায় এসেছে আন্তর্জাতিক পুলিশিং সংস্থা ইন্টারপোল। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বর্তমানে ৫৯ জন বাংলাদেশিকে ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় রাখা হয়েছে। তালিকায় থাকা অন্যদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে পলাতক রাজু ঢালী, দক্ষিণ আফ্রিকায় পলাতক মিজান মিয়া এবং ভারতে পলাতক মুদ্রাপাচারকারী আজিজুর রহমান ও অজয় বিশ্বাস অন্যতম। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খন্দকার আব্দুর রশিদ, নূর চৌধুরী ও শরিফুল হক ডালিমের নামেও রেড নোটিশ বহাল রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই দুর্নীতিবাজকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *