জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে ৬০ দেশের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

 

জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে বিশ্বের প্রায় ৬০টি বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই শুল্ক শুক্রবার থেকে কার্যকর হবে।

এর আওতায় যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান ও ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার রয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। এর ফলে চলতি বছরের শুরুতে বিদেশি পণ্যের ওপর অস্থায়ীভাবে চালু করা ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদ শেষ হবে এবং তার পরিবর্তে নতুন হার কার্যকর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বছর ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করার নীতি গ্রহণ করেন। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছিলেন যে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল তার অনেকগুলোই আইন অনুযায়ী বৈধ ছিল না। আদালতের সেই রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন আইনি উপায়ে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতে শুরু করে।

গত মাসে হোয়াইট হাউস প্রথম জানায়, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানি ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি তাদের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে এই শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে। এক বিবৃতিতে গ্রিয়ার বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম—দুই সমস্যারই মোকাবিলা শুরু হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের শ্রমিকদের স্বার্থও সুরক্ষিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নতুন শুল্ক আরোপে ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারার আওতায় এমন বিদেশি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যায্য বলে বিবেচিত হয়।

এর আগে চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করে কানাডার কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এসব দেশ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসে। দপ্তর আরো জানায়, ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধের বিষয়টিকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন। এ পর্যন্ত ১০টি বাণিজ্যিক অংশীদার জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক তদন্তের পর আরো কয়েকটি দেশ একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে এবং তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে। আর যেসব দেশ এমন পদক্ষেপ নেয়নি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রিয়ার বলেন, অনেক দেশ দ্রুত এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা চালু করায় তিনি উৎসাহিত। তবে শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও করতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, আমদানি শুল্ক বাড়ালে মার্কিন শ্রমিকরা সুরক্ষা পান, দেশে উৎপাদন বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়। ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তিনি সেই উদ্যোগকে ‘মুক্তি দিবস’ (লিবারেশন ডে) হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি ছিল, দীর্ঘদিন ধরে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য করেছে এবং সেই পরিস্থিতি বদলাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সেই শুল্কের বড় অংশ বাতিল করে দেন। আদালত জানান, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন। আদালতের রায়ের পর যেসব প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত শুল্ক পরিশোধ করেছিল, তাদের কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়া হয়।

এরপর হোয়াইট হাউস নতুন আইনি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতে শুরু করে। সেই সময় সব বিদেশি পণ্যের ওপর অস্থায়ীভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যার মেয়াদ শুক্রবার শেষ হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ব্রাজিল, কানাডাসহ আরো কয়েকটি দেশের ওপর আলাদা শুল্ক আরোপ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য যুদ্ধও শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমানে সেই উত্তেজনা কিছুটা স্থগিত রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্ক বাড়লে কফি, মাইক্রোওয়েভসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কারণ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত শুল্ক পরিশোধের খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেয়।

ট্রাম্প প্রশাসন শুধু বাণিজ্য নয়, অন্যান্য নীতিগত বিষয়েও চাপ সৃষ্টি করতে শুল্ককে একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে শ্রমনীতি নিয়ে মেক্সিকোর ওপরও শুল্কের মাধ্যমে চাপ দেওয়া হয়েছে। নতুন এই শুল্কের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আইনি আপত্তি জানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ কিংবা আদালতে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আরো কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি ১৬টি দেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের শেষ দিকে ওই দেশগুলোর বিরুদ্ধেও নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *