২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে সামনে রেখে রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। করদাতাদের আস্থা বাড়ানো, কর ব্যবস্থাকে সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা, ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ কমিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কার, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমস্যা সমাধান, করজাল সম্প্রসারণ, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব আহরণ কৌশল নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের কথা শোনেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর একটি রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করবে এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।
একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরের বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেন, লক্ষ্যটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের প্রয়োজনেই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর।
মাঠের সমস্যা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
রাজস্ব সম্মেলনের দ্বিতীয় এ আয়োজন এবার শুধু রাজস্ব প্রশাসনের সাফল্য প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাস্তব সমস্যা, জনবল সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিবহন সংকট, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে আন্তঃসংযোগের ঘাটতি এবং রাজস্ব আহরণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে।
সারাদেশ থেকে আসা এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী। পরে এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্মকর্তারা রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে জনবল, অবকাঠামো ও পরিবহন সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের ব্যয় মাত্র ২১ পয়সা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এই ব্যয় অত্যন্ত কম। ফলে রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া এনবিআরের সঙ্গে অন্যান্য সরকারি সংস্থার প্রয়োজনীয় আন্তঃসংযোগ না থাকার কারণে বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা
সম্মেলনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে রাজস্ব প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ সংকটের চিত্রও উঠে আসে।
শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের কমিশনার নাহিদা ফরিদি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতিকর ও অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল।
এনবিআর সংস্কারকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে অনেকের কাজের আগ্রহ কমে গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়। তিনি কর্মকর্তাদের এ ‘পীড়াদায়ক পরিস্থিতি’ থেকে বের করে স্বাভাবিক পরিবেশে কাজের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের বিষয় নিয়ে পড়ে না থেকে সামনে এগিয়ে যেতে চায় সরকার। সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চায় এবং কর্মকর্তাদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে কাজের পরিবেশ ও উৎসাহ তৈরির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

করদাতার আস্থায় জোর
রাজস্ব সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল করদাতাদের আস্থা অর্জন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করা গেলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়। এ জন্য কর ব্যবস্থাপনা ও কর আদায়ের পদ্ধতিকে সহজ, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বরং অর্থনীতিতে কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে তাদের করজালের আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন করদাতা স্বাভাবিকভাবে কর পরিশোধ করলে রাষ্ট্রের উচিত তাকে সম্মান দেওয়া। অন্যদিকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহার করলে তাকেও যথাযথ প্রক্রিয়ায় কর প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে।
তার মতে, আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য কেবল বেশি পরিমাণ কর আদায় করা নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। করদাতারা যেন কর দেওয়াকে বোঝা বা হয়রানির বিষয় হিসেবে না দেখেন, বরং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কর দিতে পারেন—এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
নতুন করদাতা খোঁজার নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় কম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
তাই নিয়মিত করদাতাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর প্রদানে সক্ষম, কিন্তু এখনো করজালের বাইরে রয়েছে, তাদের যথাযথভাবে শনাক্ত করে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
এক্ষেত্রে ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন সরকারপ্রধান।
তিনি রাজস্ব কর্মকর্তাদের আধুনিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দক্ষ করে তোলার নির্দেশনা দেন। তাঁর মতে, অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব প্রশাসনকেও আধুনিক হতে হবে।

ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব
কর প্রশাসনের আধুনিকায়নে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সম্মেলনে।
বর্তমানে করদাতা শনাক্তকরণ, রিটার্ন দাখিল, তথ্য যাচাই, অডিট, কর ফাঁকি শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রম আরও তথ্যনির্ভর করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর প্রদানে সক্ষম মানুষ ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। এজন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং আন্তঃসংযোগ গড়ে তুলতে হবে।
ডিজিটাল, আধুনিক ও ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তুলতে পারলে একই করদাতাকে বারবার চাপ না দিয়ে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র থেকে রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব হবে বলে সম্মেলনে মত উঠে আসে।
সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করার তাগিদ
সম্মেলনের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী কাস্টমসের পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ নেন। পণ্য খালাসে কোথায় জটিলতা রয়েছে এবং কীভাবে এ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা যায়, তা জানতে চান তিনি।
সংশ্লিষ্ট প্রথম সচিব পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। কোথায় সময় বেশি লাগছে এবং কোন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়েও তিনি জানতে চান।
এ সময় জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে পণ্য খালাস দ্রুত করার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন এবং কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার ক্ষেত্রে সিঙ্গেল উইন্ডো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সম্মেলনে আলোচনা হয়।

দুই ভাগে এনবিআর
রাজস্ব সম্মেলনে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ঘোষণা আসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে।
তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় একটি প্রতিষ্ঠান রাজস্ব নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে এবং অন্য প্রতিষ্ঠান রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগ সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। এখানে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।
অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে ‘অ্যাকশন টিম’। এই প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে রাজস্ব আহরণ, কর ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
এ সংস্কারের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের বাস্তবায়ন কার্যক্রমের মধ্যে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
তবে কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে তাড়াহুড়ো না করে ধাপে ধাপে এগোনো প্রয়োজন। রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনকে আরও দক্ষ করতে শুধু আমলানির্ভর কাঠামোর পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
সামনে বড় রাজস্ব লক্ষ্য
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্মেলনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৌশল।
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানান, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। স্বাভাবিকভাবেই এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে দেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
তাঁর মতে, দীর্ঘ সময়ের মন্থরতা কাটিয়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে এটি একটি সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত। এখন সেই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে আগামী অর্থবছরের বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।
উৎসে করকে চালিকাশক্তি
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসে আয়কর কর্তনকে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
এ জন্য রপ্তানি, খুচরা বিক্রয়, জুয়েলারি, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং লভ্যাংশ আয়ের মতো খাতগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যেসব খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য, কিন্তু কর আদায়ের সম্ভাবনার তুলনায় নজরদারি কম, সেসব খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো হবে। অনিবাসী করদাতাদের ওপর নজরদারি, বকেয়া কর আদায়, অডিট কার্যক্রম জোরদার এবং মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগও নেওয়া হবে।

ভ্যাটে বাড়বে করজাল
ভ্যাট খাতেও করজাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় সম্মেলনে।
নতুন ভ্যাটদাতা শনাক্ত করা, নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের হার বাড়ানো এবং ভ্যাট প্রশাসনের নজরদারি আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পণ্যের গতিপথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া এবং রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
কাস্টমসে দ্রুত সেবা
শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন, দ্রুত পণ্য খালাস, বন্ড ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ এবং চোরাচালান প্রতিরোধে জোর দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
ব্যবসা-বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে শুল্ক ফাঁকি ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।
কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজস্ব আদায়ের ইতিহাসও প্রদর্শনীতে
রাজস্ব সম্মেলনে শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নয়, রাজস্ব আহরণের ইতিহাস ও বর্তমান ব্যবস্থাপনার চিত্রও তুলে ধরা হয় বিভিন্ন স্টলে।
কাস্টমস, ল্যান্ডপোর্ট ও বিমানবন্দর স্টলে চোরাচালানের সময় উদ্ধার হওয়া সোনার বিভিন্ন চালান প্রদর্শন করা হয়। দর্শনার্থীদের সামনে দেখানো হয় কীভাবে বিভিন্ন পণ্যের ভেতরে অভিনব কৌশলে সোনা লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
রামবুটানের ভেতরে সোনার রিং, কফির মিনি প্যাকেট ও ট্যাংয়ের প্যাকেটে দানাদার সোনা, কুলিং ফ্যান ও দরজার কবজায় সোনার পিণ্ড, ছাতা, পানির ট্যাপ, পাওয়ার ব্যাংক, সাবান, খেলনা গাড়ি ও বইয়ের ভেতরে লুকানো সোনার বিভিন্ন নমুনা প্রদর্শন করা হয়।
এসবের পাশাপাশি ডায়েরির মলাটে লুকানো হেরোইন এবং জ্যাকেটের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো সোনার পেস্টও প্রদর্শন করা হয়।

পুরোনো মুদ্রা ও দলিল
সম্মেলনের প্রদর্শনীতে শুধু চোরাচালান প্রতিরোধের নমুনাই ছিল না; রাজস্ব ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিবর্তনও তুলে ধরা হয়।
দুর্লভ মূর্তি, বিভিন্ন দেশের পুরোনো মুদ্রা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট ও পুরোনো প্যাকেট, ভ্যাট-কাস্টমস-আয়কর সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দলিল প্রদর্শন করা হয়।
এ ছাড়া আয়কর প্রবর্তনের ইতিহাস, সম্রাট শাহ আলম ও মোহাম্মদ শাহের আমলের মুদ্রা এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যবহৃত পুরোনো টাইপরাইটারও প্রদর্শনীতে রাখা হয়।
এর মাধ্যমে দেশের রাজস্ব প্রশাসনের দীর্ঘ ইতিহাস থেকে বর্তমানের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় উত্তরণের চিত্র তুলে ধরা হয়।
আধুনিক ব্যবস্থার প্রদর্শন
অন্যদিকে ই-রিটার্ন, করসাথি, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো, কাস্টমস ও আয়কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন স্টলে আধুনিক রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।
প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে করদাতাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে এবং কাস্টমস কার্যক্রমকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ও স্টলগুলোতে উপস্থাপন করা হয়।
এতে একদিকে যেমন রাজস্ব ব্যবস্থার পুরোনো ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব প্রশাসনের চিত্রও সামনে এসেছে।

কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা
সম্মেলন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘদিনের জড়তা কাটিয়ে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
সারাদেশ থেকে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্মেলনে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করেন। বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন, ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সমস্যা নিয়েও তারা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করেন।
রাজস্ব প্রশাসনের ভবিষ্যৎ কাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজস্ব আহরণের নতুন কৌশল নিয়ে সম্মেলনে সরাসরি আলোচনা হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
রাজস্ব সম্মেলনের সচিব ও কর পরিদর্শন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মহিদুল হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেছেন এবং সম্মেলনের কার্যক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
বড় লক্ষ্য, বড় সংস্কার
সব মিলিয়ে এবারের রাজস্ব সম্মেলন থেকে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। একদিকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে এনবিআরের কাঠামোগত পরিবর্তন—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে একই সঙ্গে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় নয়। বরং করজাল সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা শনাক্ত, কর ফাঁকি বন্ধ, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং করদাতাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন কাঠামোয় রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আলাদা করা, মাঠপর্যায়ের সমস্যা সমাধান, কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার শক্তিশালী করা এবং করদাতাদের হয়রানি কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘদিনের জড়তা অনেকটাই কাটবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
তবে বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে করদাতার আস্থা, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই এবারের রাজস্ব সম্মেলনে ভবিষ্যৎ রাজস্ব আহরণের কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার এবং নতুন রাজস্ব কৌশল বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, এখন সেটিই হবে রাজস্ব প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি করদাতাবান্ধব, স্বচ্ছ, সহজ ও আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
