হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কী চলছে

আন্তর্জাতিক স্লাইড

 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত আছে। এর মধ্যেই প্রাথমিক চুক্তি পরবর্তী আলোচনা করতে সুইজারল্যান্ডে গেছেন এই দুই দেশ ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা।

স্মারকে প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় প্রতিবন্ধকতা এবং অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। স্বাক্ষরের খবর প্রকাশের পর কিছু জাহাজ চলাচলও করে। তবে ইরান শনিবার জানিয়েছে, তারা জলপথটি আবার বন্ধ করে দিয়েছে।

কারণ হিসেবে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। অর্থাৎ, লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটির সামরিক কমান্ড খতম আল-আম্বিয়ার সদরদপ্তর জানিয়েছে, ‘প্রণালি বন্ধ আছে।’ তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি, নৌ চলাচল বন্ধ হয়নি।

মার্কিন সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ২০ জুন প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বেড়েছে। শনিবার পর্যন্ত অন্তত ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ ওই পথ অতিক্রম করেছে।

হরমুজ ঘিরে কী চলছে?

তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বরাত দিয়ে আরটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেশ কয়েকটি জাহাজ প্রণালিতে চলাচল করেছে। এর মধ্যে তিনটি সৌদি সুপারট্যাঙ্কার এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পাঁচটি ইরানি জাহাজ আছে।

আর জাহাজ পর্যবেক্ষণের ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও সংখ্যা কমেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রণালিতে চলাচলকারী ট্যাঙ্কারের সংখ্যা ২৫টিতে পৌঁছেছিল। শুক্রবার তা কমে এক অঙ্কের সংখ্যায় নামে।

এদিকে হরমুজ সচল ও সমঝোতা নিয়ে ভিন্ন রকম তথ্য দিয়েছেন ইসলামাবাদে যাওয়া ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাবাভিয়ান দাবি করেছেন, চলমান আলোচনা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুমোদিত শর্তগুলোর তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন।

গত সপ্তাহে মোজতবা একটি চিঠি প্রকাশ করে জানান, তিনি এই আলোচনার বিরোধী ছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি আলোচনার অনুমতি দিয়েছেন। শর্ত ছিল ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরক্ষা অক্ষের মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এই মিত্র বলতে মূলত হিজবুল্লাহকে বোঝানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নাবাভিয়ানের ওই বক্তব্য প্রচারের সময় তা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘোষণা দেওয়া হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বক্তব্যের জেরে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

অনুষ্ঠান চলাকালে হরমুজ ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে নাবাভিয়ান বলেন, ‘বিপ্লবের নেতা হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরানের একচ্ছত্র অধিকার, চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়, শত্রুপক্ষের জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থ জনগণ, শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহতদের জন্য বরাদ্দ করার ওপর জোর দিয়েছেন।’

গার্ডিয়ান লিখেছে, ইরানের আলোচকরা সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন- এমন অভিযোগ দেশটির অভ্যন্তরে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সুইজারল্যান্ডেও কি হরমুজ হাতিয়ার?

সমঝোতা স্মারকের ১৪টি দফা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, এগুলোর একটি আরেকটির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো একটি শর্ত না মানলে বাকিগুলোও পূরণ হবে না। যেমন- পঞ্চম দফায় হরমুজ প্রণালি সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো টোল নেওয়া হবে না।

তবে ১৩ নম্বর দফায় গিয়ে বলা হয়েছে, ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর দফা মেনে চলার ভিত্তিতে উভয়পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেবে। যেহেতু এক নম্বর দফা মেনে লেবাননে হামলা বন্ধ হয়নি, ফলে ইরানও ৫ নম্বর দফা পূরণ করছে না।

হরমুজ বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। স্মারক স্বাক্ষরের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, তিনি বিশ্বকে মন্দার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, রোববার শুরু হওয়া ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরান হরমুজকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করতে চাইবে।

সরু জলপথটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা না হওয়ার ইঙ্গিত খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই পাওয়া গেছে। শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, যুদ্ধবিরতি চলার ৬০ দিনের সময়কালে হরমুজে কোনো ধরনের টোল আরোপ করা হবে না। ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কোনো টোল থাকবে না।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, যদি চুক্তি সম্পন্ন না হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই টোল আরোপ করতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ‘অভিভাবক’ হিসেবে যে সেবা দিয়েছে বা দেবে সেটির ব্যয় পুনরুদ্ধারের জন্য টোল কাজে লাগানো হবে।

ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ বন্ধ ঘোষণা ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাল্টা পরিকল্পনার কথা ইঙ্গিত দেয়, জলপথটি কেন্দ্রিক সংকট দ্রুতই কাটছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *