উত্তরবঙ্গকে কৃষিশিল্পের রাজধানী করা হবে: জামায়াত আমির

রাজনীতি স্লাইড

ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গকে কৃষিশিল্পের রাজধানীতে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশন এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। পাশাপাশি রংপুরের তিস্তা বাঁধ সমস্যার সমাধানও করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

গতকাল শুক্রবার উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং বিভাগীয় শহর রংপুরে পৃথক চারটি নির্বাচনী সমাবেশে এসব প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াত আমির।

১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোট এসব সমাবেশের আয়োজন করে।পঞ্চগড়ের সমাবেশ : গতকাল সকাল ১১টায় পঞ্চগড় শহরের চিনিকল মাঠে শুরু হয় নির্বাচনী সমাবেশ। দুপুর ১২টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে সেখানে পৌঁছেন জামায়াত আমির। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওই সমাবেশে তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষিশিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

পঞ্চগড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো আবার চালু করতে চাই। আগামী দিনে আপনাদের সঙ্গে নিয়েই দায় ও দয়ার বাংলাদেশ গড়তে চাই।’উত্তরবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে গরিব করে রাখা হয়েছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চল আমাদের কলিজার অংশ। অথচ ইচ্ছা করেই একে পিছিয়ে রাখা হয়েছে, অবহেলা করা হয়েছে।

আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বলছি, উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দিতে পাঁচ বছরই যথেষ্ট। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’জামায়াত আমির বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা দায়িত্ব দিলে আমরা প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলব। পঞ্চগড়েও বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। যাঁরা ভেবেছেন এত টাকা কই পাব; ২৮ লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা বের করে আনা হবে।

বক্তব্য শেষ করে জামায়াত আমির জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত পঞ্চগড়-১ আসনের প্রার্থী সারজিস আলমের হাতে শাপলাকলি প্রতীক তুলে দেন। এরপর পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সফিউল আলমের হাতে তুলে দেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক।

সমাবেশে সারজিস আলম দখলদার, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করার আহবান জানান।

সমাবেশে রাশেদ প্রধান বলেন, ‘নতুন ইমাম বারবার বলেন দিল্লিও নয় পিন্ডিও নয়—সবার আগে বাংলাদেশ, তখন সাধারণ মানুষ শোনে, দিল্লিও নয় পিন্ডিও নয়—সবার আগে লন্ডন।’

দিনাজপুরের সমাবেশ

গতকাল দুপুর ২টায় দিনাজপুরের বড় মাঠে আরেকটি সমাবেশ হয়। সেখানে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি দেন। এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘কৃষিকে আর পুরান ধাঁচে চালানো হবে না। এখানে আধুনিকায়ন করে, আধুনিক লজিস্টিক সরবরাহ করে ন্যায্যমূল্যে তা কৃষকের হাতে তুলে দিয়ে আমরা এই জমির উৎপাদন বাড়িয়ে তুলব।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জায়গায় জায়গায় ফসল ও সবজির সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে। সারা বছর দেশের মানুষ ন্যায্য দামে কৃষি পণ্যগুলো পাবে।’

ঠাকুরগাঁওয়ে সমাবেশ

গতকাল বিকেল ৪টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরেকটি সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হবে, যাতে শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং কৃষিভিত্তিক পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘এবার শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, বরং দেশের মুক্তিকামী মানুষের ১০ দলের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মকে ভোট দেওয়ার আহবান জানাই। ঐক্যবদ্ধ জাতি ছাড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আগামীর বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার পরিচালনায় তিনটি শর্ত মানতে হবে—কোনো দুর্নীতি করা যাবে না এবং দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না; গরিব-ধনী, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুঃশাসন ও বৈষম্যমূলক রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে।’

তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘আগামী দিনে উত্তরবঙ্গ থেকে আর কোনো বেকারের মুখ দেখতে চাই না। প্রত্যেক যুবক-যুবতীকে মর্যাদার কাজের মাধ্যমে দেশ গড়ার কারিগর বানানো হবে। বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো চালু করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনা হবে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের কার্ড।’

রংপুরে সমাবেশ

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া পৃথক আরেক সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শাফিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও এখানকার মানুষের প্রতি সরকারের যে দায়িত্ব ছিল তা যথাযথভাবে পালিত হয়নি।  প্রতিবছর বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলোর কারণে এই এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকে। এই নদীগুলো বিশাল নিয়ামত হওয়া সত্ত্বেও দশকের পর দশক নদীগুলোর সংস্কার না করে বরাদ্দ করা অর্থ লুটপাট করা হয়েছে, ফলে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। নদী জীবন ফিরে পেলে উত্তরবঙ্গও জীবন ফিরে পাবে। তাই এই নদীগুলোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।’

জামায়াত তার দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘জনসাধারণের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে অতীতে অনেকে কথা দিয়ে রাখেনি, তবে এদের ওপর কেন বিশ্বাস রাখা হবে? ৫ আগস্টের পর আমরা কথা রেখেছি; মজলুম হওয়া সত্ত্বেও কারো ওপর প্রতিশোধ নিইনি এবং কোনো প্রকার চাঁদাবাজি বা মামলা বাণিজ্যে লিপ্ত হইনি।’

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন,  ‘আমরা এতটুকু চাই—আমাদের রংপুরের মানুষের জমি, ভিটেবাড়ি ও ঘরবাড়ি যেন নদীগর্ভে বিলীন না হয়।  ভারতের কর্তৃপক্ষ বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেওয়ার অন্তত তিন দিন আগে আমাদের যেন জানায়, যাতে তিস্তাপারের মানুষ তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারে এবং ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে পারে। আমরা ভারতের সঙ্গে এমন ন্যায্যতার সম্পর্ক চাই।’

সমাবেশের শেষ দিকে জামায়াতের আমির রংপুর-১ আসনে জামায়াতের রায়হান সিরাজি (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-২-এ জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-৩-এ জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-৪ আসনে এনসিপির আখতার হোসেন (শাপলাকলি) এবং রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের গোলাম রব্বানীর হাতে (দাঁড়িপাল্লা) প্রতীক তুলে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *