অভিশংসনের পরই গৃহবন্দি প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

আন্তর্জাতিক স্লাইড

ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারি, ব্যাংক দুর্নীতি ও নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের আবর্তে পড়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন প্যারাগুয়ের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া। একটি বিতর্কিত ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে কংগ্রেস কর্তৃক অভিশংসিত হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট পেনিয়ার সরাসরি প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়াতলেই ‘উয়েনো ব্যাংক’ অস্বাভাবিক ও দ্রুত গতিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তবে সম্প্রতি অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় জমে যাওয়ায় ব্যাংকটির কার্যক্রম আকস্মিকভাবে স্থগিত বা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ব্যাংকটির প্রায় ২৯ লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণভাবে জব্দ হয়ে যায়, যা দেশটির মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। আকস্মিক এই বিপর্যয়ের কারণে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ নিজেদের কষ্টের জমানো টাকা তুলতে না পেরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার ও মৌলিক চাহিদা মেটানোর মতো ন্যূনতম অর্থও হাতে না থাকায় নাগরিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক সংকটে প্যারাগুয়ের রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র গণবিক্ষোভ ও জনরোষ দমনে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি দেখে পেনিয়ার নিজের রাজনৈতিক দলও তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। খুচরা বাজারে কেনাবেচা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি থমকে দাঁড়ায়। এই প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মাঝেই গত সপ্তাহে ত্বরিত গতিতে শুরু হওয়া অভিশংসন প্রক্রিয়া শেষ হয় শুক্রবার (৬ নভেম্বর)। ওই দিনই প্রেসিডেন্ট পেনিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন নেতা বা দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা।

ক্ষমতা হারানো ও গৃহবন্দি হওয়ার পর সান্তিয়াগো পেনিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত জালে কঠোর শিকড় গেড়েছে। প্যারাগুয়ের সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, পেনিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিং বা অর্থ পাচারের মতো অত্যন্ত গুরুতর সব অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো কেলেঙ্কারির পেছনে রয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। সরকারের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় তহবিল এবং জাতীয় পেনশন তহবিল থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৮৬ কোটি মার্কিন ডলার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে উয়েনো ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। তা ছাড়া, খোদ বরখাস্ত হওয়া প্রেসিডেন্ট পেনিয়ারও ওই ব্যাংকের মূল অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ লাখ ডলার সমমানের ব্যক্তিগত শেয়ার ছিল, যা তিনি কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে বা বিতর্ক এড়াতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। প্যারাগুয়ের বিরোধী দলের সিনেটররা এই ঘটনাকে দেশটির গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন দুর্নীতি ও প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর পর প্যারাগুয়ের এই ক্ষমতাধর নেতা গোপনে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে নানা গুঞ্জন ও কানাঘুষা শুরু হয়েছিল। তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারির কারণে তিনি নিজ বাসভবন থেকেই বের হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আইনগত ও রাজনৈতিক সব সুরক্ষার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে সরাসরি সাধারণ আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং নিজের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধের জবাবদিহি করতে হচ্ছে। প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দ্রুততম ও নাটকীয় পতনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *