মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের বিপর্যয় ও অভাবনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কাছে বিপুল ব্যবধানে হেরে কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করেছে দলটি। ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছুটা আসন হারালেও, এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই ব্যাপক ভরাডুবিকে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনামল ও প্রশাসনিক নীতিমালার ওপর মার্কিন ভোটারদের এক তীব্র ও জোরালো অনাস্থা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, ইরানের বিরুদ্ধে বিতর্কিত যুদ্ধ, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় মারাত্মক পতন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীর ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝোঁকা—এই পাঁচটি প্রধান কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের এই বিশাল রায় এসেছে।
১. জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপ
সমগ্র যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, যা নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে নির্বাচনী প্রচারের সময় সাধারণ মানুষের সেই অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন মুদি পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে বাধ্য হয়েই তিনি দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সমর্থন ত্যাগ করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক পণ্যের গড় দাম বেড়েছে প্রায় ৩.৭ শতাংশ। বিশেষ করে জ্বালানি ও শক্তির মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে রেকর্ড ৬ ডলার ৫২ সেন্টের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর।
নির্বাচনকালীন এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার ও তাদের পরিবার মূল্যস্ফীতির প্রভাবে তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার মান সংকোচনের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি ভোটার স্পষ্ট জানান যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি ও নেওয়া পদক্ষেপগুলোর কারণেই পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। ফলে ব্যালট বাক্সে তারা ট্রাম্প ও তার দলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
২. ইরান যুদ্ধের প্রভাব ও মাগা সমর্থকদের ক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মূল্য চরম আকার ধারণ করার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ইরান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আকস্মিক সামরিক অভিযান শুরু করলে তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ঘোষণা করে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন পথ অবরুদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ধস নামে। এর প্রত্যক্ষ মাশুল গুনতে হয় মার্কিন নাগরিকদের, যাদের পেট্রল পাম্পে গিয়ে চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছে।
এই সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশেষ করে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থকদের কাছে এটি সরাসরি ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে পরিগণিত হয়। কারণ, ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় কোনো নতুন বৈশ্বিক যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন অর্থ ও সম্পদ অপচয় না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান আক্রমণকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক চরম ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। পাশাপাশি ৭৪ শতাংশ ভোটার স্পষ্ট জানান যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ তাদের সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। নির্বাচনের পরদিন ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেন যে, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকা ছিল। তবে তিনি নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে রুখতে তার সামনে নাকি অন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের সুনির্দিষ্ট প্রচার কৌশল ও সফল প্রার্থীরা
ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এই নির্বাচনে অত্যন্ত সুসংগঠিত, আক্রমণাত্মক এবং ধারাবাহিক প্রচার চালিয়ে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে সমর্থ হন। তারা অমূল্যায়নযোগ্য তত্ত্বের কথা না বলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং উন্নত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের পুরো প্রচারণা পরিচালনা করেন।
অঙ্গরাজ্যভেদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের কৌশলী প্রচার বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয়। টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসে ধর্মীয় যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন নিজেদের ধর্মীয় ও মানবিক বিশ্বাসকে সাধারণ মানুষের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা সেখানকার রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যেও গভীর প্রভাব ফেলে।
একইভাবে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় শিশু চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয় বড় এক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ও চিকিৎসা খরচ কমানোর বিষয়টিকে প্রচারের প্রধান অস্ত্র বানান।
মিশিগানে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা আবদুল এল-সায়েদ রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো ও সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফেরত দেওয়ার স্লোগান তুলে ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বপূর্ণ আসন ধরে রাখেন।
অন্যদিকে জর্জিয়া থেকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ বিশাল ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন, অথচ গত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যটিতে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। মাত্র ৩৯ বছর বয়সী অসফের এই অসামান্য বিজয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ট্রাম্প নিজেও ডেমোক্র্যাটদের চমৎকার প্রচারের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। পক্ষান্তরে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মাঠে অত্যন্ত অলস ও নীতিহীন প্রচার চালানোর তীব্র সমালোচনা উঠে এসেছে।
৪. ট্রাম্পের ঝরে পড়া জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ
অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধনীতির মতো সংবেদনশীল দুই ব্যর্থতা সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায়, তার মাশুল গুণতে হয়েছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের। এমনকি নিজের দলের ভেতরে ও কট্টর সমর্থকদের মাঝেও ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা আগের জায়গায় নেই। যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে ট্রাম্প দুই বছর আগে বড় জয় পেয়েছিলেন, সেখানেও তার জনপ্রিয়তায় ধস নামায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্প দেশজুড়ে জনসভায় সমর্থকদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারা যেন রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সময় ব্যালটে তার নিজের মুখটিই কল্পনা করেন। অর্থাৎ, তিনি প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতার চেয়ে নিজের ব্যক্তিপ্রতিপত্তিকে বাজিমাত করার হাতিয়ার করেছিলেন। তবে টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করা ট্রাম্পের এই ব্র্যাণ্ড তার নিজস্ব আকর্ষণ হারাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন চরমে, তখন রিপাবলিকানদের প্রচারের কেন্দ্রে নিজেকে বসানো ট্রাম্পের জন্য এক মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা জরুরি ছিল। অথচ নির্বাচনের আগের সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের শেষ নির্বাচনী ভাষণে তিনি মার্কিনদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ বা অর্থনীতি নিয়ে একটি শব্দও খরচ না করে, দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাম্প হোটেলের বাইরের বিতর্কিত রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার প্রকল্পের আত্মপ্রচারেই ব্যস্ত ছিলেন। এই আচরণ সাধারণ ভোটারদের পুরোপুরি ট্রাম্প-বিমুখ করে তোলে।
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মূল স্রোতে প্রত্যাবর্তন
গত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বড় অংশের রিপাবলিকান বাক্সে ভোট দেওয়া। তবে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই বিশাল ভোটার গোষ্ঠীটি পুনরায় ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনে ফিরে এসেছে, যা রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হিস্পানিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত ৩টি গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেশনাল আসনেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক মেজরিটি এলাকাগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন এক লাফে ২২ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক রাজনীতিতে বিশাল এক পরিবর্তন। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর বিতর্কিত ও কঠোর পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ কাজ করছিল। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, দেশের অন্তত ৫৬ শতাংশ মানুষ আইসের ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
অনুরূপভাবে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি মিসিসিপির মতো তীব্র রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যেও যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার প্রায় ৩৭ শতাংশ, সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলম রিপাবলিকানদের চরম প্রতিযোগিতায় ফেলে দিয়েছেন। তিনি বিজয়ী হলে তা হবে ১৯৮২ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর মিসিসিপি থেকে মার্কিন সিনেটে ইতিহাস রচনা করে নির্বাচিত হওয়া। ভোটারদের এই ধারাবাহিক পরিবর্তনই রিপাবলিকানদের চূড়ান্ত পরাভব এনে দিয়েছে।
