চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ১১ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হয়নি। এই তিন মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় প্রায় ৩১ শতাংশ কম হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ কাস্টমস কর্তৃপক্ষের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের স্বয়ংক্রিয় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট ২২ হাজার ৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত এই সময়ের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ৩২ কোটি টাকা। ফলে প্রথম প্রান্তিক শেষে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক আদায় বেড়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছিল ১৯ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এবার রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বা ১০.৯৬ শতাংশ।
সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি হ্রাস ও ঘাটতি বৃদ্ধি প্রথম তিন মাসের সমন্বিত চিত্রে রাজস্বের বড় ঘাটতির পেছনে সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি কমে যাওয়াকে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪.১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯০.৮৪ লাখ টনে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্যও প্রায় ৩ শতাংশ কমে ৪৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস মোট ৭ হাজার ৫৮১ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। যদিও গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে এই আদায় ৮.৩১ শতাংশ বেশি, তবুও নির্ধারিত একক মাসের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় পিছিয়ে ছিল ২৭.৯০ শতাংশ।
শুল্ক স্তরভিত্তিক আয়ের বিপরীতমুখী প্রবণতা বিভিন্ন শুল্ক স্তরের (Customs Duty Slabs) দিকে তাকালে রাজস্ব আদায়ে এক চরম ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- ২৫% শুল্ক স্তর: উচ্চ শুল্কযুক্ত বা ২৫ শতাংশ স্তরের পণ্য আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই খাত থেকে রাজস্ব আদায় আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২,০৩৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
- ৩% শুল্ক স্তর: বিপরীতভাবে, সর্বনিম্ন বা ৩ শতাংশ শুল্ক স্তরের পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় আশ্চর্যজনকভাবে ২৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- অন্যান্য শুল্ক স্তর: ১০ শতাংশ শুল্ক স্তর থেকে ১,৩৩৬ কোটি টাকা, ৫ শতাংশ স্তর থেকে ৮৭৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ১৫ শতাংশ স্তর থেকে ৫৯০ কোটি টাকা, শূন্য (০) শতাংশ স্তর থেকে ৮০৪ কোটি টাকা এবং ১ শতাংশ স্তর থেকে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে সংগৃহীত হয়েছে।
আমদানি ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি রাজস্বের বিশাল ঘাটতি থাকলেও সামগ্রিক আমদানি ও বাণিজ্য চিত্রে কিছুটা গতি দেখা গেছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সামগ্রিক পণ্যের আমদানির পরিমাণ আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ৩.৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় আড়াই কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে কাস্টমসে আনা পণ্যের মোট শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের পরিমাণ ৯.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪৬,৮০১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশেষ করে ৩ শতাংশ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি এক লাফে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। এসব স্বল্প শুল্কের পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্যও প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬,৬৭২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। রাজস্ব বিশ্লেষকদের মতে, মোট পণ্যের আমদানি ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বাড়লেও মূলত উচ্চ শুল্কযুক্ত (যেমন ২৫%) পণ্যের চেয়ে কম শুল্কের (যেমন ৩%) পণ্য বেশি আমদানি হওয়ার কারণেই রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা সার্বিক রাজস্ব পরিস্থিতি এবং লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমীন বলেন, “আমাদের কাস্টমসের রাজস্ব আদায় মূলত দেশের ভেতরে আমদানি হওয়া পণ্যের ধরন ও পরিমাণের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে। প্রথম প্রান্তিকে সামগ্রিক আমদানিতে বেশি শুল্কযুক্ত পণ্যের উপস্থিতি থাকার ফলেই রাজস্ব আদায়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।”
সেপ্টেম্বর মাসের চিত্র উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “সেপ্টেম্বর মাসে টন হিসেবে আমদানির সার্বিক পরিমাণ কিছুটা কমলেও উচ্চমূল্যের পণ্য বেশি আসার কারণে মাসিক রাজস্ব আদায় ধনাত্মক বা ইতিবাচক ছিল। আগামী মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানি প্রবাহ আরও বেগবান হলে এবং শুল্কযুক্ত পণ্যের সরবরাহ বাড়লে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সাথে রাজস্ব আদায়ের এই বিদ্যমান ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
