পুতিনের সামনে নতুন পরীক্ষা

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

রাশিয়ায় এই সপ্তাহে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ নিয়ে দেশের মানুষের মতামত বোঝার জন্য এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে রুশ সরকার।

১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নির্বাচন হবে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর এটি হবে দেশটির প্রথম সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে পুতিনের পুনর্নির্বাচনের পর এটি হবে রাশিয়ার দ্বিতীয় বড় জাতীয় নির্বাচন।

যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে রাশিয়ার অনেক মানুষ এখন ক্লান্ত।

ইউক্রেনের পাল্টা হামলাও বাড়ছে। এ কারণে অনেকের আশঙ্কা, নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরো নতুন সৈন্য নিয়োগ করতে পারেন। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের কিছু এলাকাতেও ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছে।

ইউক্রেনের অনেক এলাকা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

রাশিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমালোচনা করা নিষিদ্ধ। তাই নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। ফলে পুতিনের দল ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’ আবারও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক এএফপিকে বলেন, এই নির্বাচন ‘একটি প্রহসন’ হলেও ক্রেমলিনের কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেশি মানুষকে ভোট দিতে কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করবে রুশ সরকার। নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করা থাকলেও এর গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন নির্বাসনে থাকা রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলাই পেত্রভ।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সোভিয়েত আমলের মতো এই নির্বাচনেও রাশিয়ার নাগরিকদের সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন ও আনুগত্য দেখানোর কথা।’

শুধু পুতিনপন্থী দলগুলোর অংশগ্রহণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলাই পেত্রোভ বলেন, ২৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, দেশের সাধারণ মানুষ এখনো তাকে সমর্থন করেন এবং তার ওপর আস্থা রাখেন, এমন বার্তা অভিজাতদের কাছে পৌঁছায়। রাশিয়ার সংসদের মোট ৪৫০টি আসনের অর্ধেক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। বাকি অর্ধেক আসনে সরাসরি প্রার্থীদের ভোট দেওয়া হবে।

জাতীয় নির্বাচনে শুধু পুতিনপন্থী ও যুদ্ধ সমর্থনকারী দলগুলোকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া, কমিউনিস্ট পার্টি, এ জাস্ট রাশিয়া, এলডিপিআর এবং নিউ পিপল। রাশিয়ায় সক্রিয় একমাত্র যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াবলোকোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

মস্কোর ১৮ বছর বয়সী ইয়েভদোকিয়া এএফপিকে বলেন, নির্বাচনে আসলে কোনো বিকল্প নেই। তিনি আগে ইয়াবলোকোকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এখন তিনি নিউ পিপলকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সরকার দেশে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দেশটিতে এত কঠোর দমন-পীড়ন আর দেখা যায়নি।

পুতিনের প্রধান বিরোধীদের অনেকেই এখন কারাগারে, নির্বাসনে অথবা মারা গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যালেক্সেই নাভালনি। তিনি ২০২৪ সালে রাশিয়ার একটি কারাগারে মারা যান। পুতিনের শাসনামলে রাশিয়ার সংসদের ক্ষমতা অনেক কমে গেলেও অতীতেও সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা গেছে। ২০১১ সালের সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে পুতিন আবার ক্রেমলিনে ফিরবেন—এমন ঘোষণার পর রাশিয়ায় বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সেটিই ছিল দেশটির অন্যতম বড় বিক্ষোভ। তবে এ বছর মস্কোতে নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কিছু পোস্টার দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টারে লেখা রয়েছে, ‘আপনার কণ্ঠই রাশিয়ার শক্তি।’

সংহতির ভয়

এই নির্বাচন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার মানুষের মনোভাব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। এই যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়েছে, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা মানুষদের জীবনেও।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। মস্কো এসব হামলাকে রাশিয়ার হামলার জবাব হিসেবে দেখছে। এসব হামলার কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছেন।

এদিকে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, নির্বাচনের পর রাশিয়া আবারও নতুন করে সেনা নিয়োগ করতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়া প্রায় ৩ লাখ রিজার্ভ সেনাকে যুদ্ধে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত তখন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এই কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নিজেই বলতে হয়েছে যে, নির্বাচনের পর নতুন করে সেনা সমাবেশের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে ক্রেমলিনের সমালোচক, ইউক্রেন এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশ অভিযোগ করেছে, এমন পরিকল্পনা রাশিয়ার থাকতে পারে।

রাশিয়ার নিষিদ্ধ কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের রুশ বিশেষজ্ঞ তাতিয়ানা স্তানোভায়া মনে করেন, নতুন করে সেনা তলবের সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার মানুষকে এ নিয়ে চিন্তা না করতে বোঝানোর জন্য তারা এত চেষ্টা করেছে। তাই এমন কিছু ঘটলে আমি খুবই অবাক হব।’

তার মতে, নির্বাচনে সহজ জয়ের মাধ্যমে পুতিন নিজের বৈধতার স্বীকৃতি দেখাতে চাইবেন। একই সঙ্গে তিনি এই ফলাফলকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন হিসেবেও তুলে ধরতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *