দেশের করব্যবস্থায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও করদাতাদের ওপর হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আহসান হাবিব ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে এক টাকাও ঘুষ দেবেন না। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
ঢাকা ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।
‘আমি দেখি কে কীভাবে ঘুষ নেয়’
অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী, আয়কর আইনজীবী এবং সাধারণ করদাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনাদেরকে বলি, সমস্ত বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদেরকে বলি—কোনো একজন এনবিআরের কর্মকর্তাকে একটি টাকা ঘুষ দিবেন না। বলি একটি টাকা ঘুষ দিবেন না, আমি দেখি কে কীভাবে আপনাদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়।”
বক্তব্যের একপর্যায়ে করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “নো নো নো, না ইয়েস বলার সময় হয়নি। একটি টাকা ঘুষ দিবেন না, দেখি কীভাবে করদাতাদের কাছ থেকে অনিয়ম করে সুবিধা নেওয়া হয়।”
সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ ও অনলাইনেই সকল সেবা
করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যবর্তী অসাধু লেনদেন এবং অনিয়ম রোধে এনবিআর নতুন কৌশল গ্রহণ করছে বলে জানান আহসান হাবিব। তিনি বলেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে এবং অসাধু সুযোগ বন্ধ করতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে করদাতার সরাসরি যোগাযোগ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে করদাতারা কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক হয়রানি ছাড়াই ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। এ ছাড়া ই-অডিটের জবাব প্রদান, করসংক্রান্ত যেকোনো ভুলত্রুটির ব্যাখ্যা দেওয়া এবং অন্যান্য যাবতীয় প্রক্রিয়া অনলাইনেই সম্পন্ন করা যাবে। এনবিআর একটি সুনির্দিষ্ট স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে সরাসরি ফেস-টু-ফেস যোগাযোগের কোনো প্রয়োজন পড়বে না।
রাষ্ট্রের নাগরিক দায়িত্ব ও বিসিএস ক্যাডারদের প্রতি ক্ষোভ
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গঠন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে এনবিআর প্রধান বলেন, রাষ্ট্র জনগণের দেওয়া করের অর্থ দিয়েই দেশ পরিচালনা করে, সড়ক-সেতু নির্মাণ করে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনকল্যাণমূলক খাত বজায় রাখে। তাই সেবা পাওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে যথাযথ রাজস্ব পরিশোধ করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম প্রসঙ্গে ক্ষোভ ও প্রশ্ন প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আচ্ছা, আপনি আমার কাছ থেকে ৫০০ টাকার ঋণ নিয়েছেন, আমাকে ফেরত দিবেন না? কেন দিবেন না? কী অন্যায় করেছি আমি? রাষ্ট্র আপনাকে দিয়েছে, লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছে।”
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, একজন বুয়েট শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে রাষ্ট্র প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্র ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করে। কিন্তু সেই শিক্ষার পর কী ঘটে? বড় চাকরি পেয়ে, বিসিএস কর্মকর্তা হয়ে সরকারি সেবায় যোগ দিয়েই কীভাবে অনৈতিক উপায়ে আরও বেশি নেওয়া যায়, সেই চেষ্টা শুরু হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর অর্থ শুধু আবেগে ভেসে যাওয়া নয়; নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে সততা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাই হচ্ছে প্রকৃত দেশপ্রেম।
১০ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি তার বক্তব্যে রাষ্ট্র গঠনে কর আইনজীবীদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় বাজেটের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণের মূল দায়িত্ব কর প্রশাসনে জড়িতদের ওপর থাকে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের প্রায় ৪২ হাজার অভিজ্ঞ কর আইনজীবী যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ও সক্রিয়ভাবে কাজ করেন, তবে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করা মোটেও অসম্ভব নয়।
একই সাথে তিনি বলেন, করজালের বাইরে থাকা সম্ভাব্য করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনতে আইনজীবীদের উদ্যোগী হতে হবে। তবে একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধেও তাঁদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নেতৃত্ব
উল্লেখ্য, ঢাকা ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কর আইনজীবী ফোরাম (নীল প্যানেল) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। নবনির্বাচিত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সভাপতি মো. মিজানুর রহমান (দুলাল) এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন খান। এ ছাড়া সিনিয়র সহসভাপতি পদে এ কে এম শহীদুল ইসলাম ও সহসভাপতি পদে মো. আবুল কালাম মজুমদার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
উক্ত অভিষেক অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরসহ অন্যান্য বিশেষ অতিথি, এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিপুলসংখ্যক আয়কর আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
