রাষ্ট্রপতির ক্ষমার্হ আদেশে শাস্তি মুক্ত এনবিআরের ২০ কর্মকর্তা

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সংগঠিত নজিরবিহীন আন্দোলনের জেরে শাস্তির মুখে পড়া ২০ জন কর্মকর্তার সব ধরনের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি টানাপোড়েন শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের ভুলের জন্য মার্জনা প্রার্থনা করে আবেদন জানালে রাষ্ট্রপতি তা মঞ্জুর করেন। এর পরিপ্রক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে শাস্তিমুক্তির এই আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই আদেশের মধ্য দিয়ে রাজস্ব প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতার অবসান ঘটল।

আন্দোলনের পটভূমি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ

২০২৫ সালের জুন মাসে রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এনবিআরের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও আন্দোলন স্তিমিত করতে প্রশাসন থেকে আন্দোলনের সমন্বয়কদের তাৎক্ষণিক বদলির আদেশ জারি করা হয়। তবে কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং এনবিআর ভবনের সামনে প্রকাশ্যে সেই বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানান।

এই ঘটনাকে ১৯৭৯ সালের ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা’র ৩০এ বিধি এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি (খ) অনুযায়ী স্পষ্ট ‘অসদাচরণ’ ও শৃঙ্খলভঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অভিযোগ ওঠে, কর্মকর্তাদের একটি দল সরাসরি আন্দোলন সংগঠিত করেন, কেউ কেউ দপ্তর বন্ধ রেখে কর্মবিরতিতে অংশ নেন এবং সার্বিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অচল করে দেন।

এনবিআর অবরুদ্ধ ও আমদানি-রপ্তানিতে স্থবিরতা

আন্দোলন তীব্র রূপ নিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এনবিআরের প্রধান কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং দেশজুড়ে টানা দুই দিনের সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে—চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন শুল্কায়ন কেন্দ্রে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ব্যবসায়িক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে কর্মকর্তারা তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হন এবং তাঁকে নিজ সংস্থায় ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তাঁরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মতো কঠোর পদক্ষেপের হুঙ্কার দেন।

সরকারের কঠোর অবস্থান ও সমঝোতা

উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয় সেবা’ (Essential Services) হিসেবে ঘোষণা করে, যাতে আইনি প্রক্রিয়ায় আন্দোলন নিষিদ্ধ করা যায়। একই সাথে সংকট উত্তরণে পাঁচজন উপদেষ্টার সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

পরবর্তীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও নেতাদের মধ্যস্থতায় অভ্যন্তরীণ বৈঠক শেষে কর্মকর্তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করেন এবং কাজে ফিরে যান। আন্দোলন শেষ হলেও শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।

বিভাগীয় তদন্ত, দণ্ডাদেশ ও দুদকের অনুসন্ধান

বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় এনবিআরের সংশ্লিষ্ট ২১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শাস্তির মাত্রায় ছিল:

  • চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর
  • সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেনশন)
  • নির্ধারিত সময়ের জন্য বেতন গ্রেড অবনমন (ডেমোশন)

এছাড়া, আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পৃথক অভিযোগ এনে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শাস্তি মওকুফপ্রাপ্ত ২০ কর্মকর্তার তালিকা

রাষ্ট্রপতির মার্জনায় যে ২০ জন কর্মকর্তা সব ধরনের প্রশাসনিক দায় ও শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তাঁরা হলেন: কমিশনার জাকির হোসেন (চলতি দায়িত্বে), অতিরিক্ত কর কমিশনার হাছান তারেক রিকাবদার, মির্জা আশিক রানা, চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, সুলতানা হাবীব, মুরাদ আহমেদ, সিফাত ই মরিয়ন, আ আ আমীমুল ইহসান, সাধন কুমার কুণ্ডু, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন, মামুন মিয়া, মাসুমা খাতুন, মোরশেদ উদ্দীন খান, সানোয়ারুল কবির, উপ কর কমিশনার জিল্লুর রহমান, ইমাম তৌহিদ হোসেন, সাইদুল ইসলাম, শাহাদাৎ জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া ও শফিউল বশর।

প্রশাসনিক পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

শাস্তি মওকুফের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার ফলে এই কর্মকর্তারা তাঁদের পূর্বের পদমর্যাদা, বকেয়া সুবিধা ও চাকরির নিয়মমাফিক ধারাবাহিকতা ফেরত পাবেন। রাজস্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা দূর করতে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যকার মনোবল ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *