ঘুষকাণ্ডে সহকারী কর কমিশনার মিতুর ৮ বছর পদোন্নতি স্থগিত

অর্থনীতি স্লাইড

বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকি দিতে সরকারি ফাইল চুরির সুযোগ করে দেওয়া এবং মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের চাঞ্চল্যকর অপরাধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে আগামী ৮ বছরের জন্য তাঁর পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই জালিয়াতি ও শত শত কোটি টাকার কর ফাঁকির ঘটনায় জড়িত ব্যবসায়ী ও আইনজীবীর বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে কর গোয়েন্দারা।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই দণ্ডাদেশ জারি করা হয়। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) যৌথ তদন্তে অপরাধের সত্যতা পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

কোটি টাকার ঘুষ চুক্তি ও গোপন ফন্দি

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, এসএ গ্রুপের কর্ণধার এবং এসএ পরিবহনের মালিক সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি এনবিআরের কর অঞ্চল-৫, সার্কেল-৯৩ এর একজন নথিভুক্ত করদাতা। দীর্ঘদিন ধরে ১২টি করবর্ষের অ্যাসেসমেন্ট শেষে এনবিআরের উপকর কমিশনার তাঁর ওপর বিপুল পরিমাণ কর নির্ধারণ করেছিলেন। এই কর এড়াতে তিনি আপিল, ট্রাইব্যুনাল এমনকি উচ্চ আদালতেও (হাইকোর্ট) আইনি লড়াই চালান, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আদালতের রায় তাঁর বিপক্ষে যায়।

আইনি সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর আয়কর আইনজীবী ওবায়দুল হক সরকার মিলে কর ফাঁকির একটি ভয়াবহ ফন্দি আঁটেন। তাঁরা সার্কেলের কর্মচারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুকে ১ কোটি টাকার ঘুষের অফার দেন। চুক্তির অংশ হিসেবে ক্যাডার কর্মকর্তা মিতুর সহায়তায় সরকারি কর অফিস থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের গত ১২ বছরের মূল আয়কর নথি (ফাইল ও রিটার্ন) চুরি করে আইনজীবী ওবায়দুল হকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়।

২৩৭ কোটি টাকার জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণ

আইনজীবীর চেম্বারে বসে ওই ১২ করবর্ষের পুরাতন ও মূল রিটার্ন পুরোপুরি বদলে ফেলে নতুন জাল রিটার্ন তৈরি করা হয়। নতুন এই ভুয়া নথিতে করফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে চতুরতার সঙ্গে অন্তত ২৩৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার “করমুক্ত আয় ও সম্পদ” যুক্ত করে দেওয়া হয়। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসল ফাইলগুলোতে অডিট শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিপুল করযোগ্য সম্পদ উন্মোচিত হয়েছিল এবং সেখানে সরাসরি ৭৫ কোটি টাকার আয়কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করে রাখা হয়েছিল।

এই অনৈতিক ও বেআইনি কাজে সহায়তার বিনিময়ে সহকারী কর কমিশনার মিতু ঘুষ হিসেবে প্রথম দফায় ৩৮ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করেন। এনবিআরের তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত স্বীকারোক্তিতে মিতু জানান, তিনি ওই ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন এবং তা ইতোমধ্যে খরচও করে ফেলেছেন। তদন্তকারীরা তাঁর মোবাইল নম্বর থেকে ঘুষের লেনদেন সংক্রান্ত একাধিক ডিজিটাল প্রমাণও উদ্ধার করেছেন।

ঘটনার বিবরণ বিস্তারিত তথ্য
অভিযোগের বিষয় ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে ১২ বছরের আয়কর ফাইল জালিয়াতি
গৃহীত ঘুষের পরিমাণ ৩৮ লাখ টাকা (নগদ)
কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে যুক্ত আয় ২৩৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা (করমুক্ত হিসেবে দেখানো)
আগে উদ্ঘাটনকৃত ফাঁকি ৭৫ কোটি টাকা
অভিযুক্ত কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু (সহকারী কর কমিশনার)
বিভাগীয় সাজা ৮ বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত

ব্যাংক হিসাব জব্দ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ

ঘটনার গোপন খবর পেয়ে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) একটি বিশেষ দল অভিযানে নামে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর সিআইসি কর্মকর্তারা আইনজীবী ওবায়দুল হক সরকারের চেম্বারে অভিযান চালিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের মূল সরকারি নথি ও ভুয়া রিটার্নগুলো উদ্ধার করেন।

ঘটনার পরিধি ও অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় সিআইসি ইতিমধ্যেই সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং তাঁর আইনজীবী ওবায়দুল হক সরকারের সকল ব্যাংক হিসাব পুরোপুরি জব্দ (ফ্রিজ) করেছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিন আহমেদ বছরের পর বছর ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন। কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেওয়া তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এনবিআর এখন তাঁর সার্বিক আয়কর নথি ও ব্যবসার আর্থিক বিবরণী নতুন করে অত্যন্ত কঠোরভাবে খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি সনদধারী আইনজীবী হিসেবে ওবায়দুল হক সরকারের বিরুদ্ধে আইটিপি (ITP) সনদ বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *