এনবিআরের বড় পদক্ষেপ: ৪ খাতের মার্কেট শেয়ার যাচাই

অর্থনীতি স্লাইড

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকি রোধে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে। এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে চারটি বৃহৎ শিল্প খাতকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। খাতগুলো হলো—সিমেন্ট, সিগারেট, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ এবং এমএস প্রোডাক্টস (রড ও ঢেউটিন)। এনবিআরের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক আয় ও অর্জিত মার্কেট শেয়ারের সঠিক অনুপাতে রাজস্ব প্রদান করছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা।

পর্যায়ক্রমে টয়লেট্রিজ, জুয়েলারিসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় ও বৃহৎ শিল্প খাতকেও এই তথ্য বিশ্লেষণ ও সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন ও মাঠপর্যায়ে নির্দেশ

ইতোমধ্যে উল্লিখিত চার খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মার্কেট শেয়ার এবং পরিশোধিত রাজস্ব পর্যালোচনা করতে এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন বিভাগের সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, মাঠপর্যায়ের ভ্যাট ও রাজস্ব অফিসগুলোকে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এনবিআরের নির্ধারিত বিশেষ ছক বা ফরম্যাটে প্রতিষ্ঠানগুলোর:

  • ব্র্যান্ডের সুনির্দিষ্ট নাম,
  • ব্যবহৃত কাঁচামালের এইচএস কোড (HS Code),
  • কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ ও বিবরণী,
  • স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত উপকরণের বিস্তারিত ডাটা প্রস্তুত করে কমিটির কাছে জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) এক সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এনবিআরের এই বিশেষ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, বড় করপোরেট হাউসগুলো যথাযথ রাজস্ব নিশ্চিত করছে কি না তা নিয়মিত ট্র্যাকিংয়ের অধীনে আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে খাতভিত্তিক মার্কেট শেয়ার হিসাব করে রাজস্বের অনুপাত নির্ণয় করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে তাদের ওপর সহনীয় ও নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

৪ খাতে রাজস্ব ফাঁকি অনুসরণের বিস্তারিত চিত্র

এনবিআরের কমিটির বৈঠকে চার খাতের উৎপাদন এবং রাজস্ব সংক্রান্ত অসঙ্গতি নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ করা হয়:

  • সিমেন্ট শিল্প: এনবিআর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এনবিআরের বৈঠকে সবচেয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে সিমেন্ট খাত নিয়ে। কমিটির পর্যালোচনায় উঠে আসে, সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদান ‘ক্লিংকার’ আমদানির বিপরীতে পরিশোধিত ভ্যাট এবং দেশের বাজারে উৎপাদিত সিমেন্টের মধ্যে বিশাল ব্যবধান বা অসামঞ্জস্য রয়েছে। গত তিন অর্থবছরে প্রচুর ক্লিংকার আমদানি হলেও তার অনুপাতে প্রত্যাশিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। ফলে ব্যবসার প্রকৃত আয়তন বের করতে ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কোম্পানিভিত্তিক ক্লিংকার আমদানির ডাটা ফের নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • সিগারেট শিল্প: সিগারেট শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতিটি ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত কাঁচামাল, আমদানি এবং স্থানীয় উপকরণের তথ্য অনুসন্ধান করা হবে। তবে বিড়ি শিল্পকে আপাতত এই মার্কেট শেয়ার যাচাই সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
  • ফুড অ্যান্ড বেভারেজ: এই খাতের বাজার ও কর ফাঁকি খতিয়ে দেখতে চারটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে তথ্য বিভক্ত করা হয়েছে—ড্রিংকিং ওয়াটার, এনার্জি ড্রিংকস, কার্বোনেটেড ড্রিংকস এবং নন-কার্বোনেটেড ড্রিংকস।
  • এমএস প্রোডাক্টস: রড, ঢেউটিন এবং প্রি-ফেব্রিকেটেড অবকাঠামো প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ব্যবহৃত সকল কাঁচামাল, এইচএস কোড এবং আমদানি বা স্থানীয় ক্রয়ের তালিকা তৈরি করে সামগ্রিক মার্কেট শেয়ার হিসাব করা হবে।

বিশেষজ্ঞ ও শিল্প নেতাদের প্রতিক্রিয়া

এনবিআরের সমন্বিত ও নিরপেক্ষ মার্কেট শেয়ার যাচাইয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি উদঘাটনের এই উদ্যোগকে রাজস্ব খাতের একটি অন্যতম ‘যুগান্তকারী পদক্ষপ’ বলে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান মন্তব্য করেন, এনবিআরের এই উদ্যোগ কেবল রাজস্ব বৃদ্ধি করবে তা নয়; বরং এটি দেশের শিল্প খাতে একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে একই কাঁচামাল ও ১ কোটি টাকার ইমপোর্ট করে একটি কোম্পানি ৪ কোটি টাকার পণ্য এবং অন্য কোম্পানি ২ কোটি টাকার পণ্য তৈরি দেখাচ্ছে—যা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং সৎ ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে ফেলে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, এনবিআরকে অবশ্যই পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ স্বচ্ছ রাখতে হবে, যেন এটি করদাতাদের ওপর নতুন কোনো প্রশাসনিক হয়রানির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে তামাকবিরোধী গবেষণা সংস্থা ‘বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি’ (বিএনটিটিপি)-এর কারিগরি কমিটির সদস্য সুশান্ত সিনহা জানান, সিগারেট খাতের সঠিক মার্কেট শেয়ার মনিটরিং ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে কেবল এই একটি খাত থেকেই অতিরিক্ত প্রায় ৭,২০০ কোটি টাকা বকেয়া রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার বাজেটে প্রিমিয়াম সিগারেটের ২০ শলাকার প্যাকেট ৪২০ টাকা (প্রতি শলাকা ২১ টাকা) নির্ধারণ করলেও কোম্পানিগুলো কৌশলে প্রতি শলাকা ২৩ টাকায় বিক্রি করছে এবং অতিরিক্ত ২ টাকার কারণে সরকার প্রতি শলাকায় ১ টাকা ৬৬ পয়সা রাজস্ব হারাচ্ছে। উৎপাদন ও সাপ্লাই ডেটা নিয়মিত নিরীক্ষা করলেই এই ফাঁকি সহজে ধরা পড়বে।

এনবিআরের রোডম্যাপ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

এনবিআরের এই বিশাল পরিকল্পনা কেবল ৪টি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। চার খাতের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও ডাটা বিশ্লেষণের সফলতার ওপর ভিত্তি করে এনবিআর একটি শক্তিশালী ‘ইনকাম ট্যাক্স ও ভ্যাট ডেটা ওয়্যারহাউস’ গড়ে তুলবে।

সময়কাল এনবিআরের মূল কৌশলগত লক্ষ্য
প্রথম ৩ মাস সিমেন্ট, সিগারেট, বেভারেজ ও এমএস প্রোডাক্টসের প্রাথমিক কাঁচামাল ও বিক্রয়ের তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা।
৬ থেকে ১২ মাস ডাটাবেজে অন্যান্য বৃহৎ করপোরেট খাত (যেমন টয়লেট্রিজ, জুয়েলারি) অন্তর্ভুক্ত করা এবং ই-অডিট চালুকরণ।
১ থেকে ২ বছর স্বয়ংক্রিয় মার্কেট শেয়ার ম্যাচিং এবং সিস্টেম-ভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management System) চালুকরণ।
৩ থেকে ৫ বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই বড় পরিবর্তন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমনই আইনি ফাঁকফোকর গলে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *