চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেন ভারসাম্যে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে একসংগে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি লাফিয়ে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৯ কোটি মার্কিন ডলারে। তবে আশার কথা হলো, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের উল্লম্ফন বহির্বিশ্বের সংগে দেশের সামগ্রিক চলক ও চলতি হিসাবে কিছুটা স্বস্তি বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাইভিত্তিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও দেশের অভ্যন্তরীন বাণিজ্য চিত্রে কিছুটা অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দেশের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলারে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের সংগে তুলনা করলে দেখা যায়, আমদানি বাবদ ব্যয় বড়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত শিল্পখাতের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের আমদানি বৃদ্ধির কারণেই এই ব্যয় বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বহির্বিশ্বে পণ্য রপ্তানি থেকে দেশের আয়ের ধারা কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। জুলাই মাসে বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠাতে পেরে বাংলাদেশ আয় করেছে ৪৩৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই মাসে এই আয়ের পরিমাণ আরও বেশি ছিল, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ। একদিকে আমদানি ব্যয়ের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধিকরণ, আর অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা—এই দুই বিপরীতমুখী চাপের ফলে দেশের আমদানি ও রপ্তানির মধ্যবর্তী ব্যবধান উল্লেখযোগ্য হারে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে অর্থবছরের শুরুতেই বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের ১৫১ কোটি ডলার থেকে বড় ব্যবধানে লাফিয়ে ২০৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
তবে বাণিজ্য খাতের এই নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও বহির্বিশ্বের সংগে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের বারসাম্য এখনও ঋণাত্মক হতে দেয়নি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। জুলাই মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই আয় গত অর্থবছরের জুলাই মাসের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল পরিমাণ এই রেমিট্যান্সই আন্তর্জাতিক আর্থিক চাপের বিপরীতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এর ওপর ভর করেই জুলাই মাস শেষে দেশের চলতি হিসাবে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত বজায় রয়েছে, যা আগের বছরের সাড় ১২ কোটি ডলার উদ্বৃত্তের চেয়ে কিছুটা কম হলেও দেশের সামগ্রিক মুদ্রা ব্যবস্থাকে ইতিবাচক রাখতে সাহায্য করেছে।
একই সংগে অর্থবছরের প্রথম মাসে আর্থিক হিসাবের (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) চিত্রে খানিকটা স্বস্তি মিলেছে। অর্থবছরের প্রথম মাসে এসে এই খাতের ঘাটতির পরিমাণ কমে ৬৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে ছিল ৮৮ কোটি ডলার। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগের দুটি প্রধান খাত—বৈদেশিক ঋণ-অনুদান প্রবাহ এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) গতি এখনও কিছুটা মন্থর। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, জুলাই মাসে দেশে সব মিলিয়ে ১১ কোটি ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ কোটি ডলার কম।
সব মিলিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি, এফডিআই ও বিদেশী সহায়তার নিম্নমুখী ধারা এবং চলতি হিসাবের সাময়িক স্বস্তির সংমিশ্রণে প্রথম মাস শেষে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ডলার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাসে যেখানে এই সামগ্রিক ঘাটতি ছিল ৫৪ কোটি ডলার, সেখানে চলতি অর্থবছরে এই ঘাটতি আরও কিছুটা বড় আকার ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য ঘাটতি সামাল দিয়ে রিজার্ভ ও লেনদেন ভারসাম্যকে স্থিতিশীল রাখতে সামনের মাসগুলোতে রপ্তানি বৃদ্ধি ও এফডিআই আকর্ষণে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
