জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যবসা সহজীকরণ ও ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যটি ছিল প্রশংসনীয়। তবে রাজস্ব আদায়ের বাস্তবে ধাক্কা খাওয়ার পর সরকারের সেই ইতিবাচক পদক্ষেপটিই এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট (মূল্যসংযোজন কর) রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের এক যুগান্তকারী সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে মাসিক হিসাব-নিকাশের জটিল চাপ কমানো এবং দেশের সার্বিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশকে আরো গতিশীল করা। কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম দুই মাসেই সরকারের ভ্যাট আদায়ের চিত্রে ব্যাপক ধস লক্ষ্য করা গেছে। রাজস্ব সংগ্রহের এই তীব্র মন্দা এনবিআর ও নীতি নির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে রাজস্বের ক্ষতি সামাল দিতে তিন মাস পরপর ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম বাতিল করে আবারও আগের মতো প্রতি মাসের ভিত্তিতে ভ্যাট আদায়ের পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনবিআর।
ইতিমধ্যেই এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করতে এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত যেন একতরফা চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত পদক্ষেপে যাওয়ার আগে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এনবিআরের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকেও বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংস্থাটির সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ভ্যাট পলিসি উইং থেকে এসংক্রান্ত একটি চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব বোর্ডের সাময়িক হিসাব ভয় ধরানোর মতো চিত্র প্রকাশ করেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টের ভ্যাট সংগ্রহের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট সংগ্রহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বিস্তারিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
| সময়কাল | বিগত অর্থবছরের আদায় | চলতি অর্থবছরের আদায় | হ্রাস/বৃদ্ধি |
| জুলাই | ১১,৫৪৭ কোটি টাকা | ৯,৩০১ কোটি টাকা | ১৯.৪% কম |
| আগস্ট | ১১,০৮১ কোটি টাকা | ৮,৩৬২ কোটি টাকা | ২৪.৫% কম |
কেবল রাজস্বের অঙ্কই নয়, এনবিআরের খাতায় ভ্যাট রিটার্ন জমাদানকারীর সংখ্যাও দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে। যেখানে গত জুনে সারাদেশে ৩ লাখ ২৮ হাজার ভ্যাট রিটার্ন জমা পড়েছিল, জুলাইয়ে এসে তা একলাফে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬ হাজারে। তবে এনবিআরের রাজস্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ভিন্ন দৃষ্টিকোণও তুলে ধরছেন। তাদের মতে, যেহেতু ব্যবসায়ীদের তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তাই সেপ্টেম্বর মাস পার হওয়ার পরেই প্রকৃতপক্ষে এই কৌশলের সফলতা বা ব্যর্থতার সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে। নিয়ম পরিবর্তনের কারণেই প্রথম দুই মাসে আদায় ও রিটার্ন কিছুটা কমেছে, যা সাময়িকভাবে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা যেতে পারে।
তবে এনবিআরের অভ্যন্তরে রাজস্ব প্রবাহ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা কাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজস্ব বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বর শেষে যখন প্রথম ত্রৈমাসিকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আসবে, তখনই বোঝা যাবে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পর ভ্যাট জমা নেওয়ার এই উদ্যোগ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ বা আত্মঘাতী ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে যে, জনগণের করের টাকা দীর্ঘদিন ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে থাকতে পারে না। কারণ, রাষ্ট্রকে পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে প্রতি মাসেই দেশি-বিদেশি ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের সুদ ও কিস্তি মেটাতে হয়। রাজকোষে নিয়মিত নগদ অর্থ না আসলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তীব্র অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
এদিকে সরকার যদি পুনরায় মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট পরিশোধের পুরোনো বিধানে ফিরে যায়, তবে তা ব্যবসা সহজ করার সব সরকারি প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে বলে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ব্যবসায়ী মহল। ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশের মতে, সরকার একবার যে সুবিধা দিয়েছে, রাজস্ব ঘাটতির বাহানায় তা হুট করে ফিরিয়ে নেওয়া হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বিদ্যমান ব্যবস্থার বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, দেশের ব্যবসায়ীদের যেখানে বছর শেষে মাত্র একবার আয়কর রিটার্ন দিতে হয়, সেখানে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়মটি এমনিতেই অত্যন্ত জটিল ও ক্ষুদ্র-মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তাদের জন্য হয়রানির প্রধান কারণ। তিনি মনে করেন, তিন মাস পরপর ভ্যাট ও রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগটি এসএমই খাতের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ছিল। এখন সরকার যদি পুনরায় আগের জায়গায় ফিরে যায়, তবে তা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ার অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীত হবে।
এনবিআর অবশ্য এর মাঝামাঝি একটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে চিন্তা করছে। তাদের পরিকল্পনা হলো—রিটার্ন জমার সময়সীমা তিন মাস পরপরই বহাল থাকবে, কিন্তু ভ্যাটের বকেয়া টাকা প্রতি মাসেই পরিশোধ করতে হবে। এনবিআরের মতে, এতে রিটার্ন জমা দেওয়ার কাগজপত্রের ঝক্কি কমবে। তবে ব্যবসায়ীরা এই যুক্তিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। দেবব্রত রায় চৌধুরীর মতে, যদি প্রতি মাসে টাকা হিসাব করে পরিশোধ করতেই হয়, তবে খাতা-কলমের হিসাব সেই প্রতি মাসেই করতে হচ্ছে। ফলে হয়রানি বা প্রশাসনিক জটিলতা কোনোটিই কমছে না, রিটার্ন জমা না দিলেও ভোগান্তি আগের মতোই বহাল থাকছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভ্যাট নিবন্ধিত বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) রয়েছে ৮ লাখেরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবি অনুযায়ী, প্রতি মাসে এর মধ্যে অন্তত ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দাখিল করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এর একটি সিংহভাগই ‘জিরো রিটার্ন’, যেখান থেকে রাজকোষে কোনো প্রকৃত ভ্যাট রাজস্ব জমা হয় না।
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মাসিক ভ্যাট ব্যবস্থার করাল গ্রাস সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। পুরান ঢাকার স্টিল ব্যবসায়ী আমির হোসেন নুরানি জানান, প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন ও হিসাব মেলানোর জন্য ছোট একটি প্রতিষ্ঠানকেও আলাদা একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা লোক নিয়োগ দিতে হয়, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়। তিন মাস পরপর ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে অর্থ পরিষদ ও প্রশাসনিক চাপের ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বস্তি মিলতো। সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবার তা কাড়িয়া নেওয়া ব্যবসা পরিচালনার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বাজেটে তিন মাস পরপর ভ্যাট পরিশোধের যে রাষ্ট্রীয় ও আইনি সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছিল, বাস্তবে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তা উপভোগ করতেই পারেননি। পুরান ঢাকা ও ঢাকার বাইরের একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগে জানা গেছে, নতুন নীতি চালু হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় ভ্যাট অফিস থেকে তাদের প্রতি মাসের নির্ধারিত তারিখের আগেই ফোন করে ভ্যাটের টাকা জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে টাকা পরিশোধের চাপ দিয়েছেন এবং ব্যবসায়ীরা জরিমানার ভয়ে নিয়মিত টাকা শোধও করে এসেছেন। কাগজের কলমে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার সুযোগ থাকলেও এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কড়াকড়ির কারণে বাস্তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে গেছেন।
সব মিলিয়ে, রাজকোষের টানাটানি আর ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধের আকুতির মাঝে এক বিশাল অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রের পরিচালনার জন্য নিয়মিত রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা সময়ের দাবি। সরকারের চূড়ান্ত বৈঠক ও ব্যবসায়ী সমিতির আলোচনার পরেই জানা যাবে ভ্যাট ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যত কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।
