৩৩ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির পরিকল্পনা বেবিচকের

জাতীয় স্লাইড

দেশের এভিয়েশন খাতে চলমান উচ্চ ভাড়ার মধ্যেই নতুন করে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিভিন্ন বিমান চলাচল-সংক্রান্ত চার্জ সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের বিমানবন্দরগুলোর এয়ারলাইনস পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী শ্রমিকদের পকেটে।

চার্জ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ ও বেবিচকের যুক্তি

বেবিচকের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে সংস্থার পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যে ব্যয় ছিল ১,১৮৬ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,২৪২ কোটি টাকায়। বর্তমান আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে মূলত বিমান চলাচল-সংক্রান্ত বিভিন্ন চার্জ থেকে।

বেবিচকের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদণ্ড অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা, ট্যাক্সিওয়ে, পার্কিং স্পেস ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ পরিশোধ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১,২৫০ কোটি টাকা ব্যয় মেটাতে হবে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ সংশোধন করা হয়েছিল এবং প্রতি ৭ থেকে ১০ বছর পর পর ফি পর্যালোচনার নিয়ম থাকায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বেবিচক সদস্য (অর্থ) মোহাম্মদ নাজমুল হক জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে এখনও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়নি।

কোন খাতে কী পরিমাণ ফি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে?

প্রস্তাবিত নথিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য হারে ফি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে:

  • অবতরণ চার্জ: আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ফ্লাইটের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ওজনের ভিত্তিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অবতরণ চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। যেমন— আন্তর্জাতিক ১০ টন ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রতি ১ হাজার কেজিতে ৫.২৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬.৫৬ ডলার এবং ১০০ টনের বেশি ওজনের ক্ষেত্রে ১২ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডলার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

  • বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার: তৃতীয় টার্মিনাল বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের চার্জ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ১০০ টনের কম ওজনের উড়োজাহাজের প্রথম দুই ঘণ্টার চার্জ ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ ডলার এবং ৩০০ টনের বেশি ওজনের ক্ষেত্রে ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩১২.৫০ ডলার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • নির্ধারিত সময়ের বাইরে অপারেশন: বিমানবন্দরের নির্ধারিত সময়ের বাইরে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে চার্জ ২৭ শতাংশ বাড়িয়ে ২২৫ থেকে ২৮৫ ডলার এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

  • আকাশপথ ও ওভারফ্লাইট চার্জ: আকাশপথ ব্যবহারে সুনির্দিষ্টভাবে ১০ শতাংশ ফি বাড়ানোর পাশাপাশি ওভারফ্লাইট চার্জ ঢাকা বিমানবন্দরের হিসাব থেকে সরিয়ে বেবিচক সদর দপ্তরের হিসাবে স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে।

যাত্রী ও হেলিকপ্টার খাতে সরাসরি আর্থিক চাপ

এই বর্ধিত ব্যয়ের বড় ধাক্কা এসে লাগবে যাত্রীদের ওপর। কারণ, টিকিটের মূল দামের সঙ্গে এই ফি সরাসরি যুক্ত হবে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া অন্যান্য টার্মিনালে বিদেশগামী যাত্রীদের ফি প্রতি ৫০০০ টাকা বা প্রায় ৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬ ডলার এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া তৃতীয় টার্মিনালের জন্য যাত্রীপ্রতি ১২.৫০ ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে, হেলিকপ্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে ওজন নির্বিশেষে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিবার ৩ হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক পরিচালনার ক্ষেত্রে ৫০ ডলার নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা এই খাতের ওপরও বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

এয়ারলাইনস ও ট্রাভেল এজেন্টদের উদ্বেগ

কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকেই বিমান ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও ব্যাংককের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এয়ারলাইনসগুলোকে ইতোমধ্যে উচ্চহারে চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ফি বাড়লে এয়ারলাইনসগুলোর বহর ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং যাত্রী যাতায়াতের গতি কমে যাবে।

এর পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্টরা অভিযোগ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বিমান ভাড়া চড়া রাখা হচ্ছে। বর্তমানে ইকোনমি শ্রেণিতে জেদ্দার একমুখী ভাড়া ৬৫-৭০ হাজার টাকা, দোহার ভাড়া ৪৫-৫০ হাজার টাকা এবং মালয়েশিয়ার ভাড়া ২৫-৩৫ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। ট্রাভেল এজেন্ট মাহমুদুল হক পিয়ারু মনে করেন, জেট ফুয়েলের মূল্য অস্থিতিশীলতার মধ্যে এ ধরনের চার্জ বাড়ানো হলে সাশ্রয়ী মূল্যে বিমান ভ্রমণের সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় তৈরি করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *