৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪.৫৭% কমেছে

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

বিশ্ব অর্থনীতির মন্থর গতি ও বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মার্কিন বাজারে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৫৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে মোট ৬১৪ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।

তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানির হ্রাসের হার এর চেয়েও বেশি হওয়ায়, মন্দার বাজারেও বাংলাদেশের বাজার হিস্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের এই মোট আমদানির পরিমাণ ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে। শুধু আর্থিক মূল্য নয়, বরং পোশাক আমদানির ভলিউম বা পরিমাণও ৮ দশমিক ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিশ্ববাজারে পোশাকের গড় একক মূল্য ২ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হওয়ার এই প্রবণতা থেকেই বোঝা যায় যে মার্কিন ক্রেতাদের মাঝে পোশাক কেনার আগ্রহ কিছুটা কমেছে।

আলোচ্য নয় মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির আর্থিক মূল্য নেমে এসেছে ৬১৪ কোটি ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৭০ শতাংশ কম। মূল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির শারীরিক পরিমাণ বা ভলিউমও ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে পণ্যের গড় একক মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের দাম ও রপ্তানি পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রেই সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

চলতি বছরের মাঝামা সময়ে কিছু আশার আলো দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। গত আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সেই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। ওই নির্দিষ্ট মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সামগ্রিক মার্কিন বাজারের আমদানির পতনের হার (৬.১৪%) তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার কিছুটা কম। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা সামান্য কমলেও তা ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশে এসে স্থিতিশীল রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ও সহযোগী দেশগুলোর রপ্তানিতে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ভিয়েতনাম থেকে দেশটির পোশাক আমদানি সামান্য বেড়ে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পাশাপাশি কম্বোডিয়া থেকে রপ্তানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, এশিয়ার অন্যতম বড় সরবরাহকারী দেশ চীন, ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এ সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, ভারত থেকে ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং পাকিস্তান থেকে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পোশাকের গড় একক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমদানি করা পোশাকের সামগ্রিক গড় একক মূল্য ২ দশমিক ১৪ শতাংশ বাড়লেও, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সাতটি এশীয় সরবরাহকারী দেশের মধ্যে পাঁচটিরই গড় একক মূল্য হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন ঘটেছে চীনের ক্ষেত্রে, যার হার ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে এর বিপরীতে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে আমদানীকৃত পোশাকের গড় একক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সামগ্রিক গড় মূল্যের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকের গড় একক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম রয়েছে। অথচ গত বছর এই মূল্য ব্যবধান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ব গড়ের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের দাম আরও কমে গেছে।

সব মিলিয়ে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সামগ্রিক বাজারে যে মন্দা নেমে এসেছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও। তবে সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার কম থাকা এবং মার্কিন বাজারে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ বাজার হিস্যা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা দেশের পোশাক খাতের টিকে থাকার সক্ষমতা প্রমাণ করে। তা সত্ত্বেও, রপ্তানি মূল্য হ্রাসের এই চলমান প্রবণতা ভবিষ্যতের আয় ও মুনাফার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *