পোশাক খাতে অস্থিরতা: ১৪৪ উসকানিদাতা চিহ্নিত, গ্রেফতার ৩৮

জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা ও নাশকতার নেপথ্যে বহুমুখী ষড়যন্ত্রের তথ্য সামনে এসেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় অনুসন্ধানে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির উসকানিদাতা হিসেবে মোট ১৪৪ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকার গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের আইনের আওতায় আনতে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাবেক মন্ত্রী থেকে শুরু করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা এবং বেশ কিছুসংখ্যক শ্রমিক সংগঠনের নেতা রাজনৈতিক ও শ্রমিক পরিচয়ের আড়ালে এই নাশকতার জাল বিস্তার করেছেন। সাধারণ শ্রমিকদের আবেগ, বিভিন্ন দাবিদাওয়া এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে অস্থিতিশীল করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের তৎপরতা ও সাবেক মন্ত্রীর নাম

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। নাশকতার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। গত ৩১ অক্টোবর গাজীপুর জেলা গার্মেন্ট টেইলার্স ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত শ্রমিক লীগের নেতা আজগর আলীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বাসিন্দা আজগর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বহু ব্যক্তিকে পোশাক কারখানায় চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন। ফলে কারখানায় তার একটি অনুগত বলয় তৈরি হয়।

৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে তিনি ছদ্মবেশে শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। জিজ্ঞাসাবাদে আজগর আলী স্বীকার করেছেন যে, সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক তাকে শ্রমিকদের মধ্যে উসকানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের সময়ও সাবেক মন্ত্রীর ফোন থেকে আজগরের মোবাইলে একাধিকবার কল আসছিল।

এছাড়া গোয়েন্দা জালে আটক হওয়া অন্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুর ব্যক্তিগত সহকারী মোহাম্মদ ওয়ালী উল্লাহ, শ্রমিক লীগ ফতুল্লা আঞ্চলিক শাখার সভাপতি হাবিবুল কবির ও সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর হোসেন, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগ নেতা মো. হৃদয় ও মোহাম্মদ পারভেজ, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম মোল্লা, জামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি হযরত আলী, কাঁচপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, সোনারগাঁ সরকারি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ফাহিম প্রধান, জেলা ছাত্রলীগ নেতা আল ইমরান, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা হাজি আক্তার নূর এবং আড়াইহাজারের বিশনন্দী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আল মামুন পারভেজ।

মিরপুর ও গাজীপুর অঞ্চলে ছদ্মবেশী নেতাদের জাল

রাজধানীর মিরপুর ও শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গোয়েন্দা অভিযানে নিষিদ্ধ সংগঠনের বহু নেতাকর্মী ও তথাকথিত শ্রমিকনেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। সম্প্রতি মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ১১ জনের সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে কামাল গাজী শ্রমিক লীগের সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গাজীপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ সংগঠনের ১০ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন—বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন গাজীপুর জেলার সভাপতি মোরশেদ আলম কাউছার, গ্রিন বাংলা গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক রোজিনা আক্তার সুমি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের তথ্য সম্পাদক মোস্তফা কামাল, ‘গাজীপুর গার্মেন্ট শ্রমিক’ ফেসবুক পেজের প্রশাসক ফুয়াদুর রহমান নির্জন এবং শ্রীপুর থানা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আলতাফ হোসেন।

শ্রমিক ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের তালিকা

সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার পেছনে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নামও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তালিকায় থাকা সাভার-আশুলিয়ার উসকানিদাতারা হলেন—বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ সারোয়ার, স্বাধীন বাংলা গার্মেন্ট শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আল কামরান, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন ঢাকা জেলার সভাপতি মিজানুর রহমান (বড়), সবুজ বাংলা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠাণ্ডু, বাংলাদেশ শ্রমজীবী গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান (ছোট), ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি ইমন শিকদার, সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোছা. নাজমা আক্তার, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের শ্রমিক কল্যাণ সম্পাদক রাসেল প্রামাণিক, বাংলাদেশ গার্মেন্ট লেবার কংগ্রেস আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম (ছোট) এবং বাংলাদেশ বিপ্লবী গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান জীবন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত অন্যান্য শীর্ষ সংগঠনের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—সিপিবির সদস্য ও গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন, ঢাকা ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি জয়নাল আবেদীন, বাংলাদেশ সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার, গার্মেন্ট শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু, মুক্ত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাগর আহমেদ (বাদশা), এবং গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি ডলি আক্তার রেহেনা।

এছাড়াও তালিকায় নাম রয়েছে—সদর মেট্রো থানা জাতীয় শ্রমিক লীগের সিনিয়র সহসভাপতি লুৎফর রহমান, মহানগর শ্রমিক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কবির আহমেদ মণ্ডল, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গাজীপুর শাখার সভাপতি রাসেল মণ্ডল, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জালাল হাওলাদার ও সভাপতি আমিনুল ইসলাম, মাদারল্যান্ড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সালেহা ইসলাম শান্তনা ও সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন ইসলাম, গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক স্মৃতি আক্তার, গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস, বাংলাদেশ গার্মেন্ট টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স গাজীপুর শাখার সহসভাপতি মোহাম্মদ তাওহিদ মিয়া, বাংলাদেশ মেটাল, কেমিক্যাল, গার্মেন্ট ও দর্জি শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফ মিয়া, গার্মেন্ট শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের ইকবাল কবির, একতা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কফিল উদ্দিন, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহীন ভূঁইয়া ও প্রচার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য লীগের সভাপতি হাসনা আলম আসমা, সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের মানিক ও আলম এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আতিকুর রহমান।

নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের উসকানিদাতা শ্রমিক নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি এম এ শাহীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, শ্রমিক নেতা মাহবুব আলম ইসমাইল, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি গাজী নূরে আলম, গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রবিন এবং শ্রমিক ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শরিফ হোসেন।

কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শুধু পেশাদার শ্রমিকনেতা বা রাজনৈতিক পদধারীরাই নন, বরং বিভিন্ন কারখানার সাধারণ কর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশের নামও উঠে এসেছে যারা উসকানিদাতা হিসেবে কাজ করছেন।

কালিয়াকৈর ও আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সিনিয়র অপারেটর বাহাদুর মিয়া, হিমেল সরকার, বাবু মিয়া, কাজী ওয়াহিদ, আনিসুর রহমান, সিনিয়র অপারেটর খুকি বেগম, জুনিয়র অপারেটর ফজলুর রহমান, কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর নাসির উদ্দিন ও আমির হোসেন, অপারেটর গিয়াস উদ্দিন ও দীপঙ্কর চন্দ্র বর্মণ, সুইং সেকশনের অপারেটর রত্না বেগম (কানা) ও মোসাম্মৎ নাসরিন, গাজীপুর সদরের পলাশতলীর সিনিয়র অপারেটর আবু তালেব, প্রতাপপুরের সিনিয়র অপারেটর জসীমউদ্দীন, নীলফামারীর সুইং সেকশনের অপারেটর শ্যামলী আক্তার, লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র অপারেটর মতিন উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জের জাহাঙ্গীর (কালিয়াকৈরে অবস্থানরত), সিরাজগঞ্জের ফিনিশিং সেকশনের আয়রনম্যান আব্দুল আলিম, জামালপুরের হেলপার আব্দুল ওয়াহাব এবং হা-মিম গ্রুপে কর্মরত আখতারুজ্জামান এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

পাশাপাশি কালিয়াকৈর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও সাবেক যুবলীগ নেতা খাত্তাব মোল্লা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও গাজীপুর জেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি সেলিমের নামও নাশকতার পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতা হিসেবে জোরালোভাবে এসেছে।

কারখানাকেন্দ্রিক সংঘাত ও বহিরাগতদের প্রবেশ

গাজীপুর অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ভোগড়া রোডেই রয়েছে প্রায় ৩০০টি কারখানা। ৫০টিরও বেশি বড় কারখানার প্রতিটিতে পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সম্প্রতি স্টারলিং অ্যাপারেলস, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড এবং অ্যাসেন্সিয়াল ক্লোদিং লিমিটেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ কারখানাগুলোতে সংঘটিত অসন্তোষ ও সহিংসতার পেছনে এই চক্রের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, বিভিন্ন আন্দোলনের সময় মুখোশ পরা সন্দেহভাজন বহিরাগতদের শ্রমিকদের মিছিলে ও সামনে থেকে উসকানি দিতে দেখা গেছে। তারা মূলত পোশাকশ্রমিক নন, বরং নিষিদ্ধ সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। নিজেদের রাজনৈতিক ও দলীয় পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে সংহতি প্রকাশের ছলে তারা নাশকতামূলক উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের মাঝে প্রবেশ করছেন। উদাহরণস্বরূপ—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস আই সাজবুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি শ্রমিকদের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ছড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

সরকারের সতর্কতা ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ

পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট তথ্য গত ১০ অক্টোবর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মাধ্যমে জমা দেওয়ার পরই প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকের পর রাজনৈতিক শাখা থেকে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বর্তমান সরকার পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য বেতন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আগামী ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণা করা হবে। এই সময়ে কোনো ধরনের প্ররোচনা বা উসকানিতে পা না দিয়ে শ্রমিকসহ সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

তবে সরকারি আহ্বানের তোয়াক্কা না করে গত ১ নভেম্বর থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে হঠাৎ করেই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে জানান, পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিতিশীলতা ও পরিকল্পিত অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একটি প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ উসকানি রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদকসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা খুব দ্রুত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হবে।

শিল্পাঞ্চলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং শিল্প পুলিশ দেশজুড়ে ব্যাপক ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপি একা ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিশেষ করে মিরপুরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় একাধিক মামলায় অন্তত ৬০ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে জড়িত বাকি অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শিল্পাঞ্চলের সুরক্ষায় অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইতিমধ্যে যৌথ বাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে আধুনিক ড্রোন এবং পুলিশ সদস্যদের শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরার (বডি ওর্ন ক্যামেরা) মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ও নিবিড় নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *