হুথিদের হামলা: সৌদিগামী ১৫৩ ফ্লাইট বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত ২২,৬৩৬ যাত্রী

জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের অব্যাহত হামলা ও নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকির কারণে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর দাম্মাগামী মোট ১৫৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে আকস্মিক এই বিপাকে পড়ে চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন ২২ হাজার ৬৩৬ জন প্রবাসী ও সাধারণ বিমানযাত্রী।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ অক্টোবর থেকে শুরু করে বুধবার (২৮ অক্টোবর) পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মোট ১৫৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৬টি ছিল সরাসরি ফ্লাইট এবং বাকি ৭৭টি ছিল ট্রানজিটভিত্তিক ফ্লাইট, যেগুলোতে যাত্রীদের অন্য কোনো দেশের বিমানবন্দর হয়ে রিয়াদ ও দাম্মামে পৌঁছানোর কথা ছিল।

বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর পরিসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এয়ারলাইন্স ভেদে ক্ষতির পরিমাণ বেশ বড়:

  • সরাসরি ফ্লাইট (৭৬টি): এর মধ্যে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৩৩টি, সৌদি আরবের ফ্ল্যাগশিপ ক্যারিয়ার সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ২০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১৩টি ফ্লাইট রয়েছে। এই ফ্লাইটগুলোর নির্দিষ্ট তারিখে ঢাকা ছেড়ে সরাসরি সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল।
  • ট্রানজিট ফ্লাইট (৭৭টি): এই তালিকায় রয়েছে ভারতের ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ৩০টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৮টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৮টি, সালাম এয়ারের ৭টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের ১টি ফ্লাইট। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো স্ব স্ব দেশ থেকে ফ্লাইট স্থগিত করায় ঢাকা থেকেও এসব ফ্লাইটে ট্রানজিট যাত্রীদের বহন করা সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ড্রাগ ও মিসাইল হামলা চালায়। এর ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সাথে সৌদির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল দাম্মামেও হামলার ঘটনা ঘটে।

এই বড় ধরনের নিরাপত্তাগত হুমকির পর প্রথম পর্যায়ে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মাগামী সকল ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বহাল থাকায় এই স্থগিতাদেশের সময়সীমা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর।

হঠাৎ করে ১৫৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় এবং ২২ হাজারের বেশি যাত্রী আটকা পড়ায় বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বহু প্রবাসী শ্রমিক যারা ছুটি শেষ করে কর্মস্থলে যোগ দিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিংবা যারা নতুন ভিসায় সৌদি আরব যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তারা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

এয়ারলাইন্সগুলো টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া বা পরবর্তী সময়ে ফ্লাইট চালুর সাপেক্ষে আসন পুনর্বিন্যাসের আশ্বাস দিলেও, আকস্মিক এই ধাক্কা প্রবাসীদের জীবন ও জীবিকায় বড় ধরনের ফেলছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে এভিয়েশন খাতে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *