ইরানজুড়ে পুরোদমে চলছে ‘আত্মত্যাগ’ কর্মসূচি

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কার মধ্যে নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে ইরান। দেশটির সাধারণ নাগরিক ও বেসামরিক জনবলকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিসরে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য যেকোনো বিদেশি আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবিলায় নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি জোটের সঙ্গে যুদ্ধের চরম সংকটময় মুহূর্তে গত মার্চ মাসের শেষ দিকে এই বিশেষ প্রতিরক্ষা কর্মসূচিটির সূচনা করেছিল ইরান। ফার্সি ভাষায় এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জানফাদা’ (Janfada), যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেন’।

শুরুতে সীমিত পরিসরে চালু হলেও বর্তমানে ইরানের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে এই কর্মসূচি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো—রাষ্ট্র ও স্বীয় ভূখণ্ড রক্ষায় বেসামরিক নাগরিকদের ভেতর দেশপ্রেমের স্পৃহা জাগিয়ে তোলা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে তাদের হাতে কলমে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া।

এই প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সর্বব্যাপী পরিধি। এতে অংশ নেওয়ার জন্য কেবল সামরিক বাহিনী বা নির্দিষ্ট কোনো বয়সের মানুষের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না, বরং দেশের সাধারণ নারী ও পুরুষ উভয়কেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।

  • তরুণদের প্রাধান্য: কর্মসূচিতে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা যেকোনো জাতীয় সংকটে প্রথম সারির প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন।
  • সবার জন্য উন্মুক্ত: তবে শুধু তরুণরাই নন, বরং সমাজের বিভিন্ন বয়সের ও পেশার মানুষ এই অস্ত্র চালনা ও আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে পুরো জাতিকে একটি সুশৃঙ্খল ও সশস্ত্র প্রতিরোধ কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে তেহরান।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় তেহরান নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা করছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে নিয়মিত নানা হুমকি-ধমকির জেরে ইরানি নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছেন যে, যেকোনো সময় দেশটিতে বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি এই ধরনের গণপ্রতিরোধ বা ‘জানফাদা’ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে ইরান সম্ভাব্য শত্রুকে একটি কঠোর বার্তা দিতে চাইছে। তা হলো—শুধুমাত্র আকাশপথ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরানকে সহজে কাবু করা যাবে না; প্রয়োজনে দেশটির সাধারণ জনতাও রাজপথে অস্ত্র হাতে আক্রমণ প্রতিহত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই কৌশলগত পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও ঘনীভূত ও জটিল করে তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *