কাঁচা টাকা বা ক্যাশ লেনদেনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এক বিপুল অঙ্কের আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অনুসন্ধানী গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশজুড়ে নগদ টাকায় বেচাকেনা ও লেনদেন সচল রাখতে বছরে যে বিপুল অঙ্কের সম্পদ অপচয় হয়, প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনে তা বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব। উক্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ, ডিজিটাল মাধ্যম চালুর মাধ্যমে দেশে নগদ লেনদেনের পেছনে হওয়া বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশেরও বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব, কারণ ক্যাশ টাকার ব্যবস্থাপনা খরচ ডিজিটাল ব্যবস্থার চেয়ে প্রায় ২৮ গুণ বেশি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ক্যাশ বা নগদ লেনদেনের বাৎসরিক মোট পরিচালনা ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের জিডিপির ৩.২৪ শতাংশ স্থান দখল করে নেয়। অপরদিকে, দেশে ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড এবং ইন্টারনেট পেমেন্টসহ সার্বিক ডিজিটাল মাধ্যমের বাৎসরিক পরিচালন খরচ হয়েছিল ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ০.১১ শতাংশ। জনপ্রতি বার্ষিক হিসাবে যেখানে নগদ লেনদেনে খরচ পড়ে ৯,৯৩৮ টাকা, সেখানে ক্যাশলেস মাধ্যমে তা নেমে আসে মাত্র ৩৪৮ টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, একটি দেশের নগদ অর্থ ব্যবস্থা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আমজনতা—তিনটি পক্ষকেই প্রতিদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক মূল্য চোকাতে হয়। টাকা ছাপানোর বিশেষ কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে প্রিন্টিং প্রেসের পেছনে খরচ, সশস্ত্র নিরাপত্তায় দূর-দূরান্তে টাকা পরিবহন, ব্যাংক শাখা ও হাজার হাজার এটিএম বুথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যাংকগুলোর বিপুল মূলধন আটকে থাকছে। তারওপর বাজারে কয়েক মাস হাতবদল হওয়ার পর ব্যাংক নোটগুলো যখন ছেঁড়া ও নোংরা হয়ে অকেজো হয়ে পড়ে, তখন সেগুলোকে ধ্বংস করে নতুন নোট ছাপানোর পুনরাবৃত্তিমূলক খরচ চালাতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেস্কে বসা পর্যালোচনা, নীতি বিশ্লেষণ, ২১টি বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার ও ৫টি দলভিত্তিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত এই গবেষণায় উঠে আসে—
-
অনিয়ম ও ছায়া অর্থনীতি: নগদ লেনদেনের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা অদৃশ্য বা ছায়া অর্থনীতির দরুন রাষ্ট্র প্রতি বছর ৯৩,৩০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
-
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পরিচালন ব্যয়: ক্যাশ কাউন্টার ও শাখা ব্যবস্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তায় প্রতি বছর ব্যাংকগুলোর পকেট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে ৩৬,৮০০ কোটি টাকা।
-
ভোক্তার সময় ও অর্থের অপচয়: ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে বা এটিএমে গিয়ে টাকা তোলা এবং টাকা বহন সংক্রান্ত কাজে সাধারণ মানুষের বাৎসরিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৮,০০০ কোটি টাকা।
তবে ডিজিটালাইজেশনের সম্ভাবনা বিশাল হলেও খাতটিতে স্থায়ী ব্যবসার মডেল দাঁড় করানো এখন মূল চ্যালেঞ্জ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিষ্টেম থেকে বছরে আয় আসছে মাত্র ২,৩০০ কোটি টাকা, অথচ ব্যবস্থাটি সচল রাখতে বছরে খরচ হয়ে যাচ্ছে ৫,৯৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছর ৩,৬৬৪ কোটি টাকার বড় রকমের আয়-ব্যয় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটাতে ও ভোক্তা আস্থা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে:
-
মার্চেন্ট ফি ও বিলম্ব: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সীমিত লভ্যাংশের ওপর বাড়তি সার্ভিস চার্জ চাপানো এবং বিক্রির টাকা হাতে পেতে বিলম্ব হওয়া।
-
প্রযুক্তিগত অনাস্থা: দুর্বল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, লেনদেন অমীমাংসিত বা ফেইল হওয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইসে সাধারণ ব্যবহারকারীর পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব।
-
প্রতারণা ও নিরাপত্তা: অনলাইনে আর্থিক প্রতারণা ও ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাওয়ার ভয়।
সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব প্ল্যাটফর্মের সাথে সংযোগে ‘বাংলা কিউআর’ প্রচার শুরু করেছে এবং এই প্রযুক্তিতে গতি আনতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর ভিত্তিক লেনদেনের ইন্টারচেঞ্জ রেইমবার্সমেন্ট ফি ০% নির্ধারণের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে কেবল প্রযুক্তি আনলেই চলবে না, ভোক্তা ও ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ডিজিটাল লেনদেনকে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও নিরাপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কেবল নগদ টাকার এই ২৮ গুণ বাড়তি খরচ থেকে রক্ষা পাবে দেশের অর্থনীতি।
