সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্নে ৫% কর ছাড়: হাতে আর ৪ দিন

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ই-রিটার্ন: আয়করে মেলা মিলবে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ ছাড়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন উদ্যোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করলে সাধারণ করদাতারা সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা পাবেন। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে করদাতাদের সময়মতো ও অনলাইনে রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রিটার্ন জমাদানকারীদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই নিয়মের আওতায় একজন ব্যক্তি করদাতা তাঁর নিট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ ছাড় পাবেন, যার সর্বোচ্চ পরিমাণ হতে পারে ২৫,০০০ টাকা। তবে এই আকর্ষণীয় সুযোগটি গ্রহণ করার জন্য করদাতাদের হাতে সময় রয়েছে আর মাত্র চার দিন। ৩০ সেপ্টেম্বরের পর রিটার্ন জমা দিলে এই বিশেষ সুবিধা আর পাওয়া যাবে না।

এনবিআরের জারি করা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা পর্যালোচনা করে জানা যায়, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এবং নির্ধারিত সময়ে আয়করের হিসাব চূড়ান্ত করতে এ ধরনের কর ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুসারে, যেসব ব্যক্তি করদাতা ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে তাঁদের বার্ষিক রিটার্ন সাবমিট করবেন, তাঁদের প্রদেয় কর হিসাব করার পর নিট করের ওপর ৫ শতাংশ রিবেট দেওয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো করদাতার নিট প্রদেয় কর যদি ১ লাখ টাকা হয়, তবে ৫ শতাংশ হারে তিনি ৫,০০০ টাকা ছাড় পাবেন এবং তাঁকে পরিশোধ করতে হবে ৯৫,০০০ টাকা। একইভাবে, বড় অঙ্কের করদাতাদের ক্ষেত্রেও এই ৫ শতাংশ হারে ছাড় হিসেব করা হবে, তবে ছাড়ের চূড়ান্ত সীমা রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে যেসকল করদাতার প্রদেয় করের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি, তাঁরাও এককালীন বড় ধরনের আর্থিক সাশ্রয় করতে পারবেন। এনবিআর সংশ্লিষ্টদের মতে, রিটার্ন দাখিলের শুরুর দিকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার আগ্রহ বাড়াতে এই প্রণোদনা বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তবে নির্ধারিত সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিন পার হয়ে গেলে করদাতাদের জন্য এ সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, অক্টোবর বা তার পরবর্তী সময়ে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা নিয়মিত নিয়মে কর পরিশোধ করবেন, কিন্তু ৫ শতাংশের এই বাড়তি প্রণোদনা সুবিধাটি পাবেন না। তদুপরি, নির্ধারিত করবর্ষের শেষ সময় অর্থাৎ ডিসেম্বর মাস অতিক্রম করার পর যদি কেউ রিটার্ন জমা দিতে যান, তবে তাঁকে আয়কর আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানা গুনতে হবে। বিলম্ব ফি এবং করের ওপর নির্ধারিত সুদের কারণে করদাতার ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে। তাই জরিমানার ঝুঁকি এড়ানো এবং সরাসরি অর্থ সাশ্রয় করার ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই রিটার্ন জমা দেওয়াকে সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার কাজ বলে পরামর্শ দিচ্ছেন কর বিশেষজ্ঞরা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ার অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবার স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির সকল করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। এনবিআরের নির্দিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে যেকোনো করদাতা সহজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের বার্ষিক আয়ের হিসাব প্রস্তুত করতে এবং ই-রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। কর পরিশোধের পদ্ধতিকেও বেশ সহজ ও আধুনিক করা হয়েছে। করদাতারা ঘরে বসেই ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার কিংবা বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো জনপ্রিয় মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে মুহূর্তেই তাঁদের করের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন। ই-রিটার্ন সিস্টেমে অনলাইন ফরম পূরণের সময় কোনো জটিলতা বা কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে করদাতারা যেন তাৎক্ষণিক সহযোগিতা পান, সে জন্য এনবিআরের একটি নিবেদিত কল সেন্টার সক্রিয় রয়েছে। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত অন্যান্য কর্মদিবসে অফিস চলাকালীন সময় ০৯৬৪৩৭১৭১৭১ নম্বরে কল করে সরাসরি বিশেষজ্ঞ দলের কাছ থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা সম্ভব।

অনলাইন ই-রিটার্ন ব্যবস্থার এই সার্বিক আধুনিকায়নের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই রাজস্ব খাতে পড়তে শুরু করেছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড সংখ্যক—প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা সফলভাবে ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাঁদের আয়কর রিটার্ন সাবমিট করেছেন। এই বিপুল সাড়াকে কেন্দ্র করেই চলতি ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির শতভাগ করদাতাকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে।

যদিও এনবিআর অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করেছে, তবুও প্রথাগত বা ‘পেপার রিটার্ন’ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে বিশেষ কিছু ছাড় রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির করদাতা, যাঁদের ক্ষেত্রে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা বেশ কঠিন বা প্রায় অসম্ভব, তাঁদের জন্য ম্যানুয়াল বা কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী সুবিধার আওতায় রয়েছেন:

  • ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রবীণ করদাতা,

  • উপযুক্ত চিকিৎসকের সনদপত্রধারী শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা,

  • বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি করদাতা,

  • কোনো মৃত করদাতার পক্ষে তাঁর আইনি প্রতিনিধি বা ওয়ারিশগণ, এবং

  • বাংলাদেশে সাময়িকভাবে কর্মরত বিদেশি নাগরিকেরা।

এদের পাশাপাশি, কোনো সাধারণ করদাতা যদি নতুন নিবন্ধন বা ই-রিটার্ন পোর্টালে লগইন ও নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো কারিগরি সমস্যায় পড়েন এবং তা দূর করা সম্ভব না হয়, তবে তিনি সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের কাছে কারণ দর্শিয়ে আবেদন করতে পারবেন। কর্মকর্তা বিষয়টির যৌক্তিকতা যাচাই করে অনুমোদন প্রদান করলে সেই করদাতা পেপার রিটার্ন জমা দেওয়ার বিশেষ অনুমতি পাবেন।

তবে সাধারণ ও সক্ষম ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আর পেপার রিটার্নে যাওয়ার সুযোগ নেই। আগামী চার দিনের মধ্যে ই-রিটার্ন জমা দিয়ে একদিকে যেমন অতিরিক্ত জরিমানা বা ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যাবে, অন্যদিকে নিট করের ওপর ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়ার নিশ্চিত সুযোগ কাজে লাগানো যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *