প্রান্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজস্ব কাঠামোর মূলধারায় আনয়ন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবে দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে সংস্থাটি। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভৌগোলিক অবস্থান ও বাজারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত বা ফিক্সড ভ্যাট আরোপের চিন্তাভাবনা চলছে।
প্রস্তাবিত ভ্যাটের হার ও ভৌগোলিক বিন্যাস
এনবিআরের প্রাথমিক রূপরেখা অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের এ উদ্যোগটি অঞ্চলভিত্তিক তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে:
-
ইউনিয়ন পর্যায়: প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট-বাজার ও গ্রামের ছোট দোকানপাটের জন্য মাসে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
উপজেলা পর্যায়: প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিকভাবে অপেক্ষাকৃত সক্রিয় উপজেলা সদর ও সংলগ্ন বাজারের জন্য মাসে ১,০০০ টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
-
জেলা সদর ও পৌর এলাকা: তুলনামূলক উন্নত অবকাঠামো ও বেশি লেনদেনের জেলা শহর এবং পৌর এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য মাসে ২,০০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে।
প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ
প্রস্তাবিত এই নীতি মূলত এক দশক আগের ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। অতীতে ব্যবসার মোট লেনদেন বা টার্নওভার যাই হোক না কেন, শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের রাজস্ব পরিশোধের নিয়ম চালু ছিল, যা প্যাকেজ ভ্যাট নামে পরিচিত ছিল।
পটভূমি: ২০১৯ সালে নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’ কার্যকর হওয়ার পর এই প্যাকেজ ভ্যাট প্রথাটি বিলুপ্ত করা হয়। বর্তমান আইনে বার্ষিক বিক্রয় বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার নিচে হলে ভ্যাট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, এবং ৫০ লাখ টাকার ওপরে লেনদেন থাকলে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের নিয়ম রয়েছে।
নতুন উদ্যোগটি কার্যকর হলে দীর্ঘদিন পর পুনরায় নির্ধারিত ভ্যাট প্রথা পরোক্ষভাবে ফিরে আসবে, যা প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট নেটওয়ার্কে যুক্ত করবে।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ কার্যক্রম
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের বাজারের অবস্থান, মোট দোকানের সংখ্যা এবং ব্যবসার ধরনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
[তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ]
│
▼
[বাজার ও দোকানের ক্যাটাগরি]
│
▼
[স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে সংলাপ]
│
▼
[চূড়ান্ত ভ্যাট আরোপ ও আদায়]
এনবিআরের সংগৃহীত প্রাথমিক জরিপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারের চিত্র উঠে এসেছে:
| বাজারের নাম ও অবস্থান | মোট দোকানের সংখ্যা | বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
| নুর নাহার প্লাজা (ঠাকুরগাঁও সদর) | ৫২টি | ৪টি দোকান সম্পূর্ণ এয়ারকন্ডিশনড (এসি) |
| বেতপট্টি বাজার (রংপুর সিটি) | ১২১টি | প্রধানত ইলেকট্রনিক্স ও পাইকারি লেনদেন নির্ভর |
| রৌমারী বাজার (কুড়িগ্রাম) | ৫০টি | সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ও প্রান্তিক পাইকারি বাজার |
প্রাথমিক লক্ষ্য অনুযায়ী, এ জরিপের ওপর ভিত্তি করে সারা দেশের প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এই নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
আদায় প্রক্রিয়া ও অ্যাপ চালুর উদ্যোগ
ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান বেছে নিচ্ছে এনবিআর:
-
মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা: প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা যেন কোনো প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সহজে ভ্যাট দিতে পারেন, সে জন্য বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার (MFS) মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
-
ভ্যাট অ্যাপ (ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা): দূরবর্তী এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্য ভবিষ্যতে একটি ডেডিকেটেড মোবাইল অ্যাপ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে সহজে ভ্যাট হিসাব ও পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও পটভূমি
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
-
মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা: ৬,০৪,০০০ কোটি টাকা
-
ভ্যাট খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা: ২,৫৭,০০০ কোটি টাকা
এই বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কেবল বিদ্যমান বৃহৎ করদাতাদের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং এযাবৎ রাজস্ব কাঠামোর বাইরে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যুক্ত করাই এনবিআরের প্রধান কৌশল।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর এ উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়নে নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস-এর পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া এই উদ্যোগের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বলেন:
-
সচেতনতা সৃষ্টি: মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের পূর্বে ব্যবসায়ীদের মাঝে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভ্যাট আতঙ্কে না ভোগেন।
-
ভবিষ্যৎ রাজস্বে প্রভাব: খুব কম পরিমাণ ভ্যাট পরিশোধে অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের পূর্ণাঙ্গ ভ্যাট বা উচ্চতর কর কাঠামোর আওতায় আনা কঠিন হতে পারে। কম টাকার ন্যূনতম ভ্যাট ব্যবসায়ীদের স্থায়ী মানসিকতায় পরিণত হলে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য ভ্যাট কাঠামো রূপরেখা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
