কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের মহা-পরিকল্পনা: তৈরি হচ্ছে সমন্বিত ডেটাবেস

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি করদাতাদের ঘোষিত আয়ের সাথে তাঁদের প্রকৃত জীবনযাত্রা, ব্যয় এবং অর্জিত সম্পদের সঠিক চিত্র মিলিয়ে দেখতে একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ডেটা ব্যবস্থার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। মূলত করদাতাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই এবং সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসঙ্গতি খুঁজে বের করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সভার কার্যপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন মাস থেকে শুরু করে পাঁচ বছর মেয়াদি মোট ছয়টি ধাপে এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। এনবিআরের লক্ষ্য হলো স্বল্পমেয়াদে এটি আরও ২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এটিকে ১৫ শতাংশে পৌঁছে দেওয়া।

করদাতার সমন্বিত প্রোফাইল ও আধুনিক প্রযুক্তি

নতুন ব্যবস্থার অধীনে প্রতিটি নিবন্ধিত করদাতার জন্য একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড’ বা সমন্বিত ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করা হবে। করদাতার আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত আয়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের বাস্তব খরচের ডিজিটাল তথ্য মিলায়েন দেখা হবে।

প্রোফাইলে যেসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে:

  • আর্থিক লেনদেন: ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, বড় অঙ্কের জমা-উত্তোলন, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের তথ্য এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের অন্যান্য রেকর্ড।
  • স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ: বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল, গাড়ি ও যানবাহনের মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ার বা মালিকানার বিস্তারিত।
  • জীবনযাত্রার ব্যয়: বিদেশে যাতায়াত বা ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ব্যয়, উচ্চমূল্যের ইউটিলিটি সংযোগ এবং বিভিন্ন সার্ভিস বিল।
  • অন্যান্য আয় ও কর: উইথহোল্ডিং ট্যাক্সের তথ্য, বাড়ি ভাড়া থেকে অর্জিত আয় এবং আমদানি-রপ্তানির প্রকৃত বিবরণী।

যদি কোনো করদাতা নিজের রিটার্নে বার্ষিক ১২ লাখ টাকা আয় দেখান, অথচ তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার লেনদেন থাকে, কিংবা তিনি যদি ১ কোটি টাকার জমি, ৫০ লাখ টাকার গাড়ি এবং বছরে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ করেন—তবে নতুন ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ম্যাচিং সিস্টেম’ এই পার্থক্যের অসামঞ্জস্য মুহূর্তের মধ্যেই শনাক্ত করে ফেলবে। এমন অসঙ্গতি ধরা পড়লে উক্ত করদাতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ’ (হাই-রিস্ক) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

অর্থপাচার রুখতে ‘কাস্টমস অ্যাটাশে’ নিয়োগের প্রস্তাব

বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং), শুল্ক ফাঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জালিয়াতি রোধে এক নতুন কৌশলগত প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটির মতে, কেবল অভ্যন্তরীণ ডেটা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য ফাঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।

সেজন্য বাংলাদেশের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর দূরদর্শন বা মিশনগুলোতে ‘কাস্টমস অ্যাটাশে’ পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে। এই কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দেশে আমদানিকৃত পণ্যের আসল উৎস, সঠিক মূল্য, রপ্তানিকারকের প্রকৃত পরিচয় এবং বিদেশি কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করবেন। এতে করে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার ও রাজস্ব ফাঁকি অনেকটাই কমে আসবে।

কর্পোরেট কর ফাঁকি বন্ধে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক

কর্পোরেট খাতের আয়কর ফাঁকি রোধে একটি তথ্যভিত্তিক এবং সিস্টেম চালিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এনবিআর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করবে:

  • কোম্পানির মোট টার্নওভারের বিপরীতে দেখানো নিট ও গ্রস প্রফিট রেশিও।
  • রিলেটেড-পার্টি ট্রানজেকশন, পরিচালকদের সম্মানী, রয়্যালটি ও সার্ভিস ফি।
  • ব্যবস্থাপনা খরচ, সুদের হার, অবচয়, মন্দঋণ এবং রিলেটেড-পার্টি লোন।
  • আমদানিকৃত উপাদানের মূল্যের সাথে স্থানীয় বিক্রয়ের মূল্য এবং ভ্যাট টার্নওভারের সাথে আয়কর টার্নওভারের সমন্বয়।

বর্তমানে এনবিআর প্রতিটি নির্দিষ্ট শিল্পখাতের জন্য আলাদা ‘ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্ক’ তৈরির কাজ করছে, যার মাধ্যমে সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের মানদণ্ড সহজে তুলনা করা সম্ভব হবে।

ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও সক্রিয় করদাতা ক্যাটাগরি

করদাতা এবং কর কর্মকর্তাদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে এনে স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট’ ও ‘ফেসলেস অডিট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি সংযোগ ছাড়াই ডিজিটাল মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর পর্যালোচনা শেষ হবে।

এছাড়া টিআইএন (TIN) ডেটাবেস পরিচ্ছন্ন করে করদাতাদের কয়েকটি স্পষ্ট শ্রেণীতে বিভক্ত করা হবে:

  1. সক্রিয় করদাতা (Active Taxpayer): যারা নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন এবং সময়মতো কর পরিশোধ করেন।
  2. অ-করদাতা কিন্তু রিটার্নদানকারী: যারা নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন কিন্তু প্রযোজ্য কর দেন না।
  3. অনিয়মিত ও টিআইএন বিহীন: যাদের টিআইএন আছে কিন্তু দীর্ঘদিন রিটার্ন দেন না, এবং যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টিআইএন নেই।

মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কর অঞ্চলের দক্ষতা প্রমাণের জন্য “নতুন সক্রিয় করদাতা তৈরি করা” কে পারফরম্যান্সের প্রধান সূচক (KPI) হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায়ে ‘ইনকাম ট্যাক্স ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলা হচ্ছে।

৩ থেকে ৫ বছরের রোডম্যাপ ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য

এনবিআর তাদের পুরো পরিবর্তনকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি সময়সীমার মধ্যে ভাগ করে বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে:

সময়কাল মূল উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন লক্ষ্য
প্রথম ৩ মাস টিআইএন ডেটাবেস ক্লিনসিং, শীর্ষ বকেয়া করদাতার তালিকা তৈরি, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি ও ধনী ব্যক্তিদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ।
৩ থেকে ৬ মাস জনসচেতনতামূলক প্রচার, ‘হাই-নেট-ওয়ার্থ ইন্ডিভিজ্যুয়াল ইউনিট’ চালুকরণ এবং পরীক্ষামূলক কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা।
৬ থেকে ১২ মাস ব্যাংক, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা, ইলেকট্রনিক অডিট সিলেকশন ও উইথহোল্ডিং লেজার চালুকরণ।
১ থেকে ২ বছর পূর্বে পূরিত (Pre-filled) আয়কর রিটার্ন সুবিধা, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট, ট্রান্সফার প্রাইসিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অটোমেটেড রিফান্ড ব্যবস্থা।
২ থেকে ৩ বছর পূর্ণাঙ্গ ‘ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস’ স্থাপন, সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট চালুকরণ ও তথ্যের স্বয়ংক্রিয় ক্রস-ম্যাচিং।
৩ থেকে ৫ বছর ট্যাক্স গ্যাপ অ্যানালাইসিস সম্পন্ন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।

বন্দর জট নিরসন ও অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ

কাস্টমস প্রশাসন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বন্দরের অখালাসকৃত এবং বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত নিলামে তোলার মাধ্যমে আটকে থাকা বিপুল রাজস্ব আহরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সংস্থাটির পাওনা বকেয়ার পরিমাণ ২৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি। পাশাপাশি বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭,১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ কর ছাড়কে আগামীতে আরও যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অর্থ মন্ত্রণালয়, ইআরডি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং এনবিআরের উচ্চপদস্থ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এনবিআরের প্রত্যাশা, এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স কেন্দ্রিক নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং কর ফাঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *