বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সম্ভাব্য সফরের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের পুরোনো সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, সে প্রশ্নের পাশাপাশি শেখ হাসিনার অবস্থান, তার প্রত্যর্পণের দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, অভিবাসন এবং আঞ্চলিক রাজনীতির মতো বিষয়গুলোও এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সফরটি শেষ পর্যন্ত কবে হবে, আদৌ চলতি সময়ে হবে কি না—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই।
সফরের প্রস্তুতি, পরে অনিশ্চয়তা
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। ভারত চলতি আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে আলোচনা ছিল। এমনকি ২১ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে সফর হতে পারে—এমন খবরও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত হয়।
তবে সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা থাকলেও দুই দেশের কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। ফলে সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা চললেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এরই মধ্যে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। ঢাকার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি বলে মনে করছে ঢাকা।
ভারত অবশ্য ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ওই কর্মসূচির আয়োজন বা বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
তবে এতে ঢাকার উদ্বেগ কমেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়েছে।
দিল্লির অবস্থান এখনো অস্পষ্ট
তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো কোনো বিস্তারিত অবস্থান প্রকাশ করেনি। সফরের সম্ভাব্য সময়, প্রস্তুতি কিংবা স্থগিত হওয়ার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে তারেক রহমানের সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বলার মতো কিছু নেই।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এই নীরবতাও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সফর নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল এবং সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়েও আলোচনা হচ্ছিল, তখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় ধারণা করা হচ্ছে, বেশ কিছু বিষয়ে এখনো সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘পারস্পরিক স্বার্থের’ ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ হলো, দুই দেশের সম্পর্ক এমন একটি কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে হবে, যেখানে উভয় দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ঢাকার দিক থেকেও একই ধরনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের কোনো তাড়াহুড়া নেই। বরং নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটি ঢাকা বুঝতে চাইছে।
হাসিনাকে ঘিরেই বড় বাধা
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধ।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এরপর থেকেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ঢাকার পক্ষ থেকে এখন তার প্রত্যর্পণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে ওই চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধসহ কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নয়, আইনি ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যার ওপরও নির্ভর করছে।
এই কারণেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে জটিল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরোনো সম্পর্কের বদলে নতুন বাস্তবতা
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ সহযোগিতা বাড়িয়েছিল।
ভারতের জন্যও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ ছিল গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের ভিত্তি অনেকটাই বদলে যায়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এখন বৈদেশিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আরও বেশি সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে চাইছে।
ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই নীতির সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও আগের কাঠামোয় ফিরবে না—এমন একটি ধারণা এখন জোরালো হচ্ছে।
দিল্লির জন্য নতুন হিসাব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, সেই নেতৃত্ব এখন ক্ষমতার বাইরে।
অন্যদিকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতাও দিল্লির নজরে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সফর বেড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আগের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হওয়াকে ভারত আঞ্চলিক কৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ভারতের একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা সেই সম্পর্ককে নতুন ভারসাম্যের ভিত্তিতে সাজাতে চাইছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, তবে সেটি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।
সীমান্তেও অস্বস্তি
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধই একমাত্র সমস্যা নয়। দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমান্তও দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্তে প্রাণহানি, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সময়ে সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের সীমান্ত এলাকায় বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, সীমান্তের বিভিন্ন অংশে ভারত একতরফাভাবে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের এই পার্থক্যও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।
অভিবাসন নিয়ে বিরোধ
অভিবাসন ইস্যুতেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ভারত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে তাদের অনিবন্ধিত বা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশ বলছে, পরিচয় যাচাই ও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
ঢাকার অভিযোগ, কখনো কখনো যথাযথ যাচাই ছাড়াই মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ভারত অবশ্য অবৈধ অভিবাসনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখে।
এই ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার বাংলাদেশবিষয়ক বক্তব্য ঢাকার রাজনৈতিক মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একইভাবে বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দিল্লিতেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে দুই দেশের রাজনৈতিক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ছোট কোনো মন্তব্যও কখনো কখনো কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণে বর্তমান সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সম্পর্ক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে আত্মমর্যাদা, সার্বভৌম সমতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।
অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়নের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ মনে করেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের সামনে একটি বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। দুই দেশই প্রতিবেশী এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে একে অপরকে এড়িয়ে চলতে পারে না।
তার মতে, সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিজে থেকেই দূর হবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাস্তব স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
অর্থনীতিই হতে পারে সেতু
রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, অবকাঠামো, সীমান্ত হাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা দীর্ঘদিনের।
বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বাজার ও যোগাযোগের অংশীদার। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা চালু রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের রাজনৈতিক সংকট কমাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তবে এজন্য উভয় পক্ষকে পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে হবে এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
সফর হলে আলোচনায় কী থাকবে
তারেক রহমানের ভারত সফর শেষ পর্যন্ত হলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়টি আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগ, অভিবাসন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ চাইবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতার ভিত্তি আরও দৃঢ় করতে। অন্যদিকে ভারত চাইবে বাংলাদেশ যেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখে।
সফরটি তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হবে না; বরং দুই দেশের নতুন সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সামনে কোন পথে সম্পর্ক
তারেক রহমানের ভারত সফর বিলম্বিত বা অনিশ্চিত হওয়া মানেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের একটি পর্যায় হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় বেশি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছে। ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের জন্যও বাংলাদেশের গুরুত্ব কমেনি। ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতির কারণে বাংলাদেশ দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী।
তাই দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষেরই রয়েছে।
তবে সেই সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে দাঁড়াবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত পরিস্থিতি, অভিবাসন, রাজনৈতিক বক্তব্য, আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণ এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সফরটি দ্রুত আয়োজন করা হবে, নাকি আরও সময় নিয়ে পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার অপেক্ষা করা হবে—সেটিও পরিষ্কার নয়।
তবে সফরকে ঘিরে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন আর শুধু পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে না। নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই নিজেদের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক প্রত্যাশার মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের সামনে তাই এখন মূল প্রশ্ন একটাই—পুরোনো আস্থার জায়গায় নতুন করে কীভাবে বিশ্বাস তৈরি হবে এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোন পথে এগোবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক।
সূত্র: আল-জাজিরা
