সহজ যাত্রার দিন ফিরছে: ফের চালু হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ ট্রেন

জাতীয় স্লাইড

 

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবার শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক এবং বহুল প্রতীক্ষিত যাত্রীবাহী ট্রেন যোগাযোগ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বন্ধ হয়ে যাওয়া তিন জনপ্রিয় আন্তর্দেশীয় এক্সপ্রেস—মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী—পুনরায় চালুর লক্ষ্যে উভয় দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নীতিগত ও প্রশাসনিক সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হতে পারে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগেই এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পর্কের নতুন বাঁক ও রাজনৈতিক পটভূমি

২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে এক ধরনের চরম তিক্ততা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে দ্বিপক্ষীয় যাতায়াত ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে। এর জের ধরে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী সব যাত্রীবাহী ট্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্য থেকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ চালুর ইতিবাচক তাগিদ দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ দুই বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে বন্ধ ট্রেনগুলো লাইনে ফেরানোর যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

ভারতীয় প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর ও নীতিনির্ধারণী বৈঠক

রেল যোগাযোগ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে এবং কার্যক্রমের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করতে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩৭তম আন্তঃসরকারি রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম)। এই বৈঠকে যোগ দিতে ভারতীয় রেলওয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। এর আগে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত গত বছরের বৈঠকেও এই ট্রেনগুলো চালু নিয়ে দুই পক্ষের প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল।

এ বিষয়ে রেলওয়ে অপারেশন দপ্তর জানায়, বাংলাদেশ অংশ থেকে ট্রেন পরিচালনার যাবতীয় কারিগরি ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া গেছে। দিল্লিতে অবস্থিত ভারতীয় রেল বোর্ড এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমেও এ বিষয়ে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।

ভিসা সুবিধা বৃদ্ধি ও ট্রেন ভ্রমণের ব্যাপক চাহিদা

প্রতিবছর শিক্ষা, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা এবং পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে ভ্রমণ করে থাকেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীলতার কারণে দীর্ঘদিন ভিসা প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর গত ২৮ জুন থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা কেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক হাজার হাজার ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে।

ভিসা প্রাপ্তি সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ট্রেন সার্ভিস। বিমান ও সড়কপথের তুলনায় কম খরচ, অধিক নিরাপত্তা, শিশুদের নিয়ে চলাফেরার স্বাধীনতা এবং আরামদায়ক আসনের কারণে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ সব সময়ই ট্রেন। ট্রেন চালুর খবর ভ্রমণপ্রত্যাশী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক স্বস্তি ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে।

আর্থিক ক্ষতি ও রাজস্ব আয়ের রাজস্ব সম্ভাবনা

বাংলাদেশ রেলওয়ের বাণিজ্যিক ও পরিচালন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার এই তিনটি যাত্রীবাহী এবং নিয়মিত মালবাহী ট্রেন পরিচালনা থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রতিবছর প্রায় আড়াই শত কোটি টাকা রাজস্ব আয় করত। কিন্তু বিগত দুই বছর ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সরকার ও রেলওয়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এছাড়াও ট্রেন সার্ভিস বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যেখানে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’-এ ২৭৪০ টাকা, খুলনা-কলকাতা ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’-এ ১৩৭০ টাকা এবং ঢাকা-শিলিগুড়ি ‘মিতালী এক্সপ্রেস’-এ ৩০১৫ টাকায় যাতায়াত করা সম্ভব ছিল, সেখানে ট্রেন বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে যাত্রীদের চড়া দামে বিমানের টিকিট কিনতে হয়েছে। যাতায়াতের এই সংকট সৃষ্টি হওয়ার পেছনে কোনো কোনো মহলের অপতৎপরতা ও পরিবহন সিন্ডিকেটের অবৈধ লাভের যোগসাজশ ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রস্তুতির চিত্র

রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেলের কোনো বিকল্প নেই। বন্ধ হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক রুটগুলো আবার চালু হলে দুই দেশের সাধারণ মানুষ সরাসরি লাভবান হবেন। আমাদের দিক থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে এবং আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা সুসংবাদ দিতে পারব।”

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন এবং মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক এই রুটের ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের বিপুল চাহিদা বরাবরই দৃশ্যমান ছিল। সাধারণত ২৫-৩০ দিন আগেই ট্রেনের সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়ে যেত। বাংলাদেশের দিক থেকে রোলিংস্টক এবং ট্র্যাকে কোনো সমস্যা নেই। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত মিললেই অল্প সময়ের নোটিশে ট্রেন দুটি দেশের লাইনে গড়ায় ফিরবে।

কূটনৈতিক ও সাধারণ ভ্রমণকারীদের মতে, উভয় দেশের সরকারের সমন্বিত এই পদক্ষেপে কেবল যাতায়াত ব্যবস্থারই উন্নতি হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকট প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *