৭২ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পাবেন সেরা করদাতার সম্মাননা: এনবিআর

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের সেরা করদাতাদের সম্মানিত করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তন এনেছে। বিদ্যমান নীতিমালায় সংশোধন এনে জারি করা হয়েছে নতুন ‘সেরা করদাতা সম্মাননা নীতিমালা’। নতুন এই নীতিমালার অধীনে ট্যাক্স কার্ড বা সম্মাননার সংখ্যা আগের তুলনায় অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার ব্যক্তিশ্রেণি ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত মিলিয়ে মোট ৭২টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মানজনক এই সেরা করদাতা অ্যাওয়ার্ড বা ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হবে। এনবিআরের এই নতুন উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো—করদাতাদের মধ্যে যেমন সঠিক সময়ে ও সঠিক পরিমাণে কর প্রদানের উৎসাহ বাড়ানো, তেমনই কেবল সৎ ও বিতর্কমুক্ত করদাতাদেরই রাষ্ট্রীয় এই বিশেষ সম্মাননার আওতায় নিয়ে আসা।

করদাতা নির্বাচন ও ক্যাটাগরি বিভাজন

এনবিআরের জারীকৃত নতুন নীতিমালা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মোট ৭২টি সম্মাননাকে প্রধানত দুটি মূল ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে—’ব্যক্তিশ্রেণি’ এবং ‘কোম্পানি/প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরি’।

                ┌──────────────────────────────────────────┐
                │     মোট সেরা করদাতা সম্মাননা (৭২টি)        │
                └────────────────────┬─────────────────────┘
                                     │
            ┌────────────────────────┴────────────────────────┐
            ▼                                                 ▼
┌───────────────────────┐                         ┌───────────────────────┐
│  ব্যক্তিশ্রেণি (৩৩ জন) │                         │  কোম্পানি/প্রতিষ্ঠান   │
└───────────┬───────────┘                         │       (৩৯টি)          │
            │                                     └───────────┬───────────┘
 ┌──────────┼────────────────────────┐                        │
 ▼          ▼                        ▼                        ▼
সর্বোচ্চ   বিশেষ শ্রেণি             পেশাজীবী                 সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫টি
করদাতা    - ২ জন সিনিয়র সিটিজেন  - বেতনভোগী, চিকিৎসক,     কোম্পানি + ২৩টি নির্দিষ্ট খাত 
(১৫ জন)   - ১ জন মুক্তিযোদ্ধা      সাংবাদিক, আইনজীবী,       (ব্যাংক, পোশাক, চামড়া, 
          - ১ জন প্রতিবন্ধী        প্রকৌশলী, স্থপতি,        ওষুধ, শিক্ষাসহ প্রতিটি
          - ৫ জন নারী করদাতা       সিএ/সিএমএ, খেলোয়াড়     খাতে ১টি করে)
                                   ও শিল্পী (৯ জন)

১. ব্যক্তিশ্রেণি (৩৩ জন)

ব্যক্তিশ্রেণিতে মোট ৩৩ জন করদাতাকে ট্যাক্স কার্ড প্রদান করা হবে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু সাব-ক্যাটাগরি রয়েছে:

  • সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী: সারা দেশের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণ আয়কর প্রদানকারী ১৫ জন ব্যক্তিকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
  • বিশেষ শ্রেনির করদাতা: সামাজিকভাবে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি ও উৎসাহ দিতে কয়েকজন বিশেষ নাগরিককে সম্মাননা দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছেন ২ জন বয়োজ্যেষ্ঠ বা সিনিয়র সিটিজেন, ১ জন গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত/বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ জন প্রতিবন্ধী করদাতা এবং ৫ জন নারী করদাতা (মোট ৯ জন)।
  • পেশাজীবী ক্যাটাগরি: বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সফল ব্যক্তিদের কর প্রদানে উৎসাহিত করতে ৯টি পেশা থেকে ১ জন করে মোট ৯ জনকে নির্বাচন করা হবে। এই পেশাগুলো হলো—বেতনভোগী কর্মজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ), খেলোয়াড় এবং শিল্পী।

২. কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরি (৩৯টি)

দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা বিভিন্ন ব্যবসা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা জানাতে ৩৯টি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে:

  • সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান: সার্বিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ কর প্রদানকারী ১৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে এই সম্মাননা দেওয়া হবে।
  • নির্দিষ্ট শিল্প ও সেবা খাত (২৪টি প্রতিষ্ঠান): জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রধান প্রধান ২৪টি খাত থেকে ১টি করে সেরা প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করা হবে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক, অখণ্ড বা অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবন বিমা, সাধারণ বিমা, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাক (আরএমজি), প্রকৌশল, ইস্পাত, কৃষি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, জ্বালানি, পাট, স্পিনিং ও টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, রিয়েল এস্টেট, চামড়া শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন, চা শিল্প, ট্রাস্ট এবং সিরামিক খাত।

নির্বাচনের স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকরণ: ৩ ধাপের বাচাই

সেরা করদাতা নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সঠিকতা বজায় রাখতে এনবিআর একটি সুনির্দিষ্ট এবং কড়া পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটি মোট তিনটি ধাপে সম্পন্ন হবে:

  1. প্রাথমিক বাছাই: প্রথম ধাপে এনবিআরের অধীনস্থ দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চল (Tax Zones) থেকে প্রাপ্ত আয়কর সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রাথমিক বাছাই কমিটি সম্ভাব্য যোগ্য করদাতাদের একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করবে।
  2. যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিং: দ্বিতীয় ধাপে এই তালিকাটি পাঠানো হবে বিশেষ যাচাই কমিটির কাছে। এই কমিটি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ঋণ স্থিতি ও ফৌজদারি রেকর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।
  3. চূড়ান্ত অনুমোদন ও গেজেট: সব তথ্য যাচাই শেষে চূড়ান্ত নির্বাচন কমিটি আইনগত ও নৈতিক দিক থেকে ত্রুটিমুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করবে। অনুমোদন শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি গেজেটে (Gazette) বিজয়ী সেরা করদাতাদের নাম প্রকাশ করা হবে এবং তাদের হাতে ট্যাক্স কার্ড ও বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হবে।

অযোগ্যতার কঠোর মানদণ্ড

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ কর দিলেই যে তারা এই সম্মাননা পাবেন—বিষয়টি তা নয়। নীতিমালায় এনবিআর স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আর্থিক অনিয়ম, আইনি জটিলতা বা নৈতিক স্খলন থাকলে সেসব করদাতাকে সরাসরি অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে। অযোগ্যতার প্রধান শর্তগুলো হলো:

  • রাজস্ব সংক্রান্ত অনিয়ম: করদাতার কাছে এনবিআরের কোনো অবিতর্কিত আয়কর বকেয়া থাকলে, আয়কর রিটার্ন নির্ধারিত সময়ের পর বা দেরিতে জমা দিলে, কর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলে কিংবা আয়কর আইনের আওতায় পুনঃউন্মোচিত মামলা अनिষ্পন্ন থাকলে তিনি বিবেচিত হবেন না। এছাড়া কাস্টমস, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ও দানকর আইনে কোনো স্বীকৃত অবিতর্কিত পাওনা বকেয়া থাকলেও অযোগ্য হবেন।
  • ঋণখেলাপ ও পুনর্গঠন: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করদাতা যদি কোনো কারণে ‘ঋণখেলাপি’ (Loan Defaulter) হিসেবে চিহ্নিত হন, অথবা সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে যদি তিনি নিজের কোনো ঋণ পুনঃতফসিল (Loan Reschedule) করে থাকেন, তবে তিনি চূড়ান্তভাবে অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।
  • ফৌজদারি ও দুর্নীতি সংক্রান্ত আইনি মামলা: করদাতার বিরুদ্ধে আয়কর আইনে ফৌজদারি মামলা চলমান থাকলে বা সাজা হলে, অর্থঋণ আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা বা দণ্ড থাকলে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা দায়ের করা হলে বা সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি এই সম্মাননা পাবেন না।
  • অর্থপাচার ও অন্যান্য রেগুলেটরি শাস্তি: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) কর্তৃক মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচারের কোনো তদন্ত চলমান থাকলে উক্ত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান বাদ পড়বেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কিংবা যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (RJSC) খাতভুক্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা আইনি আইনি পদক্ষেপ চলমান থাকলেও সম্মাননার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।

ভিআইপি মর্যাদা ও বিশেষ সুবিধাসমূহ

চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করদাতারা শুধু সম্মাননাই পাবেন না, বরং গেজেট প্রকাশের দিন থেকে পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত একাধিক বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধা উপভোগ করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া বিশেষ সুবিধাসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ভ্রমণে অগ্রাধিকার ও লাউঞ্জ ব্যবহার: সেরা করদাতারা সড়ক, রেল, আকাশপথ কিংবা নৌপথে ভ্রমণের সময় পরিবহন টিকেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। بالإضافة, দেশের সব বিমানবন্দর, প্রধান প্রধান রেলওয়ে স্টেশন এবং নদী নৌ-টার্মিনালের ভিআইপি লাউঞ্জ (VIP Lounge) ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
  • আবাসন ও হোটেল বুকিং: সরকারি সার্কিট হাউজে কক্ষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাবেন। এছাড়া দেশের যেকোনো তারকা হোটেলসহ আবাসিক হোটেলগুলোতে রুম বুকিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ও অগ্রাধিকার মিলবে।
  • চিকিৎসাসেবা: করদাতা নিজে, তাঁর স্বামী বা স্ত্রী এবং তাঁদের সন্তানরা যেকোনো সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনে কেবিন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন।
  • জাতীয় অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ: জাতীয় দিবসসমূহ (যেমন: স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি) এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে তাদেরকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
  • পাসপোর্ট ও বিআরটিএ সেবা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) থেকে গাড়ি নিবন্ধন/লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে এবং বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস থেকে পাসপোর্ট প্রাপ্তি ও নবায়নের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যেকোনো জটিলতা ছাড়াই দ্রুত ও অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ সুবিধা পাবেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এই নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে কর সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হবে এবং সৎ, সুসংগঠিত ও আইন মেনে চলা করদাতারা সমাজে যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *