১৯৮৪ সালের তীব্র আন্দোলনের ফসল হিসেবে আজকে এই দিনে ঝালকাঠি কে জেলা ঘোষণা

৪০

এইচ এম রিয়াজ খান,ডেস্ক রিপোর্টঃ সবুজ মাঠ গাছ-গাছালী, নদী-নালা, খাল-বিল, অপার সৌন্দর্য্যমন্ডিত ৭৫৮.০৬ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট পরিপাটি জেলা ঝালকাঠি। কবি জীবনানন্দ দাশ এর বিখ্যাত কবিতা আবার আসিব ফিরে কবিতার ধানসিঁড়ি নদীটি এ জেলায় অবস্থিত । এ জেলার আছে এক গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস । এ জেলাটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত হলে ও এর কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে ।সুগন্দা বিশখালি ধানসিঁড়ির মতো বিখ্যাত নদী এ জেলায় বুক চিড়ে প্রবাহিত।

ঝালকাঠি ভূখন্ডে ঠিক কবে থেকে জনবসতি শুরু হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও নাম দেখে বোঝা যায়-এখানে অতি প্রাচীনকাল হতে কৈবর্ত জেলে সম্প্রদায়ের লোকেরাই প্রথম আবাদ আরম্ভ করেছিল। কৈবর্ত জেলেদের ঝালো বলা হতো এবং তাদের পাড়াকে বলা হতো ঝালোপাড়া। অনেকের ধারণা এ ঝালোপাড়া থেকেই ঝালকাঠি নামের উৎপত্তি। কবি বিজয়গুপ্ত মনসামঙ্গল কাব্যেও জেলে সম্প্রদায়কে ঝালো নামে উল্লেখ করেছেন। মেহেদীপুরের জেলেদের সঙ্গে স্থানীয় লোকদের মনোমালিন্য দেখা দিলে তারা বাসন্ডা ও ধানহাটা খালের উভয় তীরে কাটাবাখারী জঙ্গল কেটে আবাদ করে বসতি স্থাপন করে। ঝালকাঠী বন্দরে পূর্বে অধিকাংশ নাগরিকই ছিল কৈবর্তদাস বা জেলে সম্প্রদায়ের লোক। বর্তমান ঝালকাঠীর পশ্চিম তীরে জেলেরা জঙ্গল সাফ করে বাসস্থান তৈরী করতঃ জেলে+কাঠি=জাল+কাঠি অপভ্রংশে ঝালকাঠি নামকরণ করা হয়েছে। এই জেলে ও জঙ্গলের কাঠি থেকেই উৎপত্তি হয় ঝালকাঠির নাম। তেমনি চাঁদকাঠি,কৃঞ্চকাঠি,চরকাঠি, বিনয়কাঠি ইত্যাদি। যা বিস্তৃত রয়েছে স্বরুপকাঠী পর্যন্ত। বিশ্বরুপ সেনের একখানি তাম্রলিপিতে ঝালকাঠি ও নৈকাঠির নামোল্লেখ আছে।এ থেকেও ঝালকাঠি নামটি যে জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া তার সমর্থন মিলে। ঝালকাঠি জেলার প্রাচীন নাম ছিল মহারাজগঞ্জ।

আমরা যদি ঝালকাঠির জেলার প্রাচীন ইতিহাসের পর্যালোচনা করি তাহলে ঝালকাঠি র সাথে বাংলার বারভূঁইয়া দের ইতিহাস জড়িত, বারভূঁইয়া শাষণামলে একজন অত্যান্ত শক্তিশালী রাজা ছিলেন রাজা কন্দর্প নারায়ন, শৌর্য-বীর্যে মহীয়ান রাজা কন্দর্প নারায়নের শাষনকৃত রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল আমাদের ঝালকাঠি,রাজা কন্দর্প নারায়ণ এর মৃত্যুর পরে ১৭৮১সালে বাংলা কে ৩৫টি জেলায় বিভক্ত করা হয়,তার মধ্যে অন্যতম জেলা ছিল উমেদপুর,আর এই উমেদপুর জেলার প্রসাশনিক সদর দপ্তর ছিল বর্তমান ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলা এ বারৈকরন গ্রামে,ঠিক ৬বছর পরে ইংরেজ সরকার বাংলার শাসন কার্য সহজ করার লক্ষ্য জেলা সংখ্যা কমিয়ে ৩৫ থেকে ২৩টি জেলায় বিভক্ত করেন,তখন এই জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়, ১৭৯৭ সালে ঢাকা বিভাগের বাকলা চন্দ্রদ্বীপ নিয়ে বাকেরগঞ্জ কে জেলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়,১৮০১ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা সদর বরিশালে স্থান্তরীত করা হয়,১৮৬১ সালে খুলনাকে বিভাগ করা হলে আমাদের জেলাকে খুলনা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়,তখন ঝালকাঠি ছিল একটি মহাকুমা,১৯৭২সালের জুন মাসের দিকে ঝালকাঠির মহাকুমাকে বরিশাল জেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পরে বাংগালী জাতীর জনক বংগবন্দ্বু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫সালের প্রথম দিকে সংবিধানের একটি সংশোধন এনে বাংলাদেশের সকল মহাকুমাকে জেলায় রুপান্তর এবং প্রতি জেলায় একজন গর্ভনর নিয়োগের সিদ্বান্ত চূড়ান্ত করেন,কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রি জাতির পিতা ও তার পরিবার সকল সদস্য
কিছু বিপদগামী অসাধু সৈনিকের হাতে নিহত হবার পরে দেশে সামরিক শাসন জারি হওয়ায় সেই সিদ্বান্ত আর গ্রহন করা হয়নি।

১৯৮৪ সালে ৪৬০ টি থানাকে উপজেলা হিসাবে ঘোষনা করা হয় এবং মহাকুমা বিলুপ্ত ঘোষণা করা, কিছু কিছু মহাকুমা কে জেলা ঘোষণা করা হলেও, ঝালকাঠি কে উপজেলা ঘোষণা করা হয়।

এরপরে শুরু হয় ঝালকাঠি কে জেলা দাবীতে কঠোর আন্দোলন “ঝালকাঠি জেলা ঘোষণা চাই”শুধু ঝালকাঠি নয় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জেলা দাবীতে সমসাময়িক সময়ে আন্দোলন সংগঠিত হয়।

যারা ঝালকাঠি জেলা চাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আজ আর এই দুনিয়াতে নেই!
(আমরা তাদের বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি)
ঝালকাঠি জেলা চাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও বর্তমানে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মুঃ আল আমিন বাকলাই তার কাছ থেকে আমরা সেই দিনে র স্মৃতিচাড়ন ও তাদের অনুভুতি জানতে চাইলে তিনি জানান—

এই আন্দোলনের সময় আমি ছাত্র, বি এ পরীক্ষা দিয়েছি,ঝালকাঠি সরকারি কলেজ থেকে।আমার বয়স তখন ২১/২২। আমি গর্বিত যে আমি সেই সময়ে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে পেরেছিলাম,যদিও পেক্ষাপট অত সহজ ছিল না, ঐ সময় বার বার তৎকালিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল বরিশাল- ঝালকাঠির দুরত্ব মাত্র ১০/১১মাইল, এত কাছে জেলার কোন দরকার নেই।আমাদের কে পুলিশ বিভিন্নরকম হয়রানি করছিল, তারপরও আমরা দমে যাইনি। আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছি।আজকে ঝালকাঠি জেলার ৩৭বছর পূর্ন হওয়ায় আমার অবশ্যই ভালো লাগছে।

ঝালকাঠি জেলা ঘোষণা চাই আন্দোলনের অগ্রগন্য নেতৃত্ব দানকারী নেতাদের মধ্য অন্যতম মরহুম এড.শাহাজাহান আশ্রাফ, এড,ছিদ্দিক হোসেন,এড,আলাউদ্দিন খান, এড.সিদ্দিকুর রহমান, এড.ফজলুল হক,ব্যবসায়ী মোঃ হানিফ খান,তৎকালিন তূখোর ছাত্রলীগ নেতা আলাউদ্দিন ভাই এবং কমিশনার আবুল কালাম।

এছাড়াও রাস্তায় রাস্তায় ব্যানার,দেয়াল লিখন সহ মিছিল মিটিং এর আয়োজনে ছিল মাহাফুজ হোসেন জুয়েল,আমি নিজে( মুঃ আল আমিন বাকলাই), শাহিনুল হক জমাদ্দার(পিপলিতা),স্টেশন রোডের লুতফুর রহমান,নুরুল ইসলাম নুরু,হেমায়েত উদ্দিন হিমু,(স্টেশন রোড)
সামসুল হুদা,ইকবাল হোসেন,শাহিন তালুকদার (নৈকাঠি)
আরো অনেকই ছিলে এই মুহুর্তে অনেকের নাম মনেও নেই।

আজকের দিনে ঝালকাঠি কে একটি মডেল জেলা হিসাবে দেখতে চাই।ঝালকাঠি – নলছিটি ভারতবর্ষের পুরাতন পৌরসভা।কিন্তু আজ তা ময়লা আবর্জনার স্তুপ।এই জেলার টেকসই উন্নয়ন দরকার।যুবদের কর্মমুখী- কারিগরি প্রশিক্ষণ দরকার। মাদক মুক্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের একটি সুন্দর জেলা হোক ঝালকাঠি, আজকের দিনে এই প্রত্যাশা করেন তিনি।

প্রচন্ড আন্দোলনের মাধ্যে ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী ঝালকাঠি কে জেলা ঘোষণা করা হয়।

ঝালকাঠি জেলার অবস্থানঃ ভৌগলিকভাবে ঝালকাঠি জেলাটি ২০০-২০’ থেকে ২২.৪৭ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০-০১’ থেকে ৯০-২৩’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।

সীমানাঃঝালকাঠি জেলার উত্তরে ও পূর্বে বরিশাল জেলা অবস্থিত, দক্ষিনে বরগুনা জেলা, পূর্বে- পটুয়াখালী জেলা ও পশ্চিমে রয়েছে পিরোজপুর জেলা।আয়তন : ঝালকাঠি জেলার আয়তন ৭৫৮.০৬ বর্গ কিঃ মিঃ।

প্রশাসনিক কাঠামোঃ ঝালকাঠি জেলায় উপজেলার সংখ্যা ৪টি। উপজেলাগুলো হল- ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঠালিয়া। এ জেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা; যেগুলো ‘ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি’ নামেই পরিচিত। এ জেলায় ৪টি থানা ও ৩২টি ইউনিয়ন রয়েছে। ইউনিয়নগুলোর মধ্যে ১০টি ঝালকাঠি সদর, ০৬টি কাঠালিয়া, ১০টি নলছিটি ও ৬টি রাজাপুরে অবস্থিত। এছাড়া ৪৭১টি গ্রাম, ৪১২টি মৌজা, ৩১টি্ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ ৮৯টি হাট-বাজারের সম্মিলন ঘটেছে এ জেলায়।

জনসংখ্যাঃ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ঝালকাঠি জেলার মোট জনসংখ্যা ৬,৮২,৬৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩,২৯,১৪৭ জন এবং মহিলা ৩,৫৩,৫২২ জন। মোট পরিবার ১,৫৮,১৩৯টি।

শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্যঃ
ঝালকাঠি জেলায় ১৮টি কলেজ, ০৯টি কারিগরি কলেজ, ১৫৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩৬টি নিমণমাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া এ জেলায় ১২৩টি মাদ্রাসা রয়েছে; যার মধ্যে ১টি কামিল, ১৫টি ফাযিল, ১৩টি আলিম ও ৯৪টি দাখিল মাদ্রাসা।

দর্শনীয় স্থানঃ গাবখান ব্রীজ,ইকোপার্ক, কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়ি,সুজাবাদ কেল্লা, ঘোষাল রাজবাড়ী, পুরাতন পৌরসভা ভবন, মাদাবর মসজিদ, সুরিচোরা জামে মসজিদ। নেছারাবাদ মাদ্রাসা, গাবখান সেতু, কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি, শের-ই বাংলা ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজ, বিনয়কাঠি

তথ্য সূত্রঃ
বরিশালের প্রাচীন ইতিহাস,
২০১১ সালের আদমশুমারী রিপোর্ট,
জাতীয় তথ্য বাতায়ন,
বাংলাদেশের জেলার নাম করনের ইতিহাস(কবীর বিলু)

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.