সেই মেয়েটি

৪৬

নীলিমা জাহান,লেখকঃ মেয়েটির নাম,পরিচয় কিছুই জানি না।বয়স ৬/৭ বছর হতে পারে।আমাদের মাঝে মাঝেই দেখা হয়। দীর্ঘদিন দেখি বিবির পুকুর পাড়,বেলস পার্ক বরিশাল শহরের পরিচিত মুখ।দেখতে দেখতেই আলাপ।পরিচিতরা আছেন কিছু ফুল কিনে দেয় সেটা বিক্রি করে চলে।
কখনো ফুল বিক্রি বা কুশল বিনিময় করে থাকে।

হঠাৎ একদিন এসে বলে “Api plz give me a some money” রীতিমত আমি অবাক।জানতে চাইলে বলে, বাবা নেই,সমস্যা পরিবারে। অন্য বাচ্চাদের মত না সে, তারপর থেকে কোন আড্ডায় বা পথে দেখা হলে জড়িয়ে ধরে বলে”তুমি কেমন আছো”।ঐ দিনের পর থেকে ওর সাথে দেখা হলে কখনও টাকা চায় নি। ও জানে আমি অসুস্থ থাকি।সে বলে”তুমি সুস্থ আছো?/তুমি ঠিকভাবে বিশ্রাম কর/ডাক্তার দেখাও “তোমাদের ত টাকা আছে ভাল চিকিৎসা করতে পারো।আমি তাকে খাবারে অফার করলে বলে “খাব না কিছু টাকা দিলে বোনের জন্য নিয়ে যেতাম”।

বেলসে পার্কে আমি প্রতিনিয়ত হাটি, একদিন একজন ভদ্রলোক ছিলেন সাথে। ওকে দুর থেকে দেখেছি।।
ভাবছি ও এসেই জড়িয়ে ধরবে সেটা হয়ত পাশের মানুষ পছন্দ করবে না, সাথে মানি ব্যাগও নেই। ও আমাকে দেখেই দৌড়াচ্ছিল আমিও ওকে দেখে দিলাম দৌড়,
–ও ধরে বলে-তুমি আমাকে দেখে দৌড়াও কেন?”
বললাম-আজ মানি ব্যাগ নেই,তোর ভয়ে দৌড় দিছি।
ও বলল-“আপু তোমার সাথে কি আমার টাকার সম্পর্ক??তুমি ত আমার আপু। দেখো অন্যদের দেখে ত আমি কাছে যাই না। তোমাকে দেখলে আমি তোমার কাছে আসবই।তুমি আর কখনও আমাকে দেখে দৌড়াবে না। তোমার কথা বাসায় বলছি একদিন নিয়ে যাব তবে আমাদের বাসা নেই এদিক সেদিক থাকি।আজ আমি তোমাকে চা খাওয়াবো চল।

এই কথা শুনে বুকটা ধুক ধুক করে উঠল।ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। কি করা উচিত বা কি বলা উচিত চুপ হয়ে গেলাম।পাশের মানুষটাও অবাক,যারা হাটছিলেন তারাও দাড়িয়ে শুনছিলেন ওর কথা। পুরো সময়টাতে এমন সুন্দর করেই কথা বলছিল।
তারপর থেকে ওকে দেখলে আমি পালাই না রিক্সা থামিয়ে কথা বলি। কিছুক্ষনের জন্য হলেও ধারনা পাল্টিয়ে দিয়েছে। রাস্তায় এমন অনেক বাচ্চারা আছে যারা টাকা চেয়ে অনেক আজে বাজে কাজ করে, আর ও ফুল,বাদাম,পপকন বিক্রি করে চলে।

বেলস পার্কে হাটি সে সুবাধে অনেক বাচ্চারা আসে ওদের সাথে ভাল আলাপ আছে, কখনও ফিরাই না। বরং ওরা ভরসা করে বলে চা খাব,এটা ওটা খাব আমি সাধ্যমত দেয়া চেস্টা করি। জানি না ওদের জীবন কিভাবে চলে।বন্ধুরা বলে এমন আর কত দিবি?তোর কাছেই কেন আসে?

আমার যদি ওর/ওদের দায়িত্ব নেয়ার সাধ্য থাকত তবে কাউকেই ফেরাতাম না। এ দায়িত্ব নেয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের। সে সুযোগ ওদের কপালে নেই। এদের মত বাচ্চারা অবহেলিত হতে হতে ক্রাইমে যুক্ত হয়ে যায়, তখন আমরা বিচার করি/শাস্তি দেই,আমাদের বাচ্চাদের ওদের সাথে মিশতে দেই না।কেউ কেউ ওদের দিয়ে অবৈধ ব্যবসা করে থাকে। ওদের ভাল মানুষ করে তোলার চেস্টা করি না।

যারা সাবলম্বী আছেন তারা যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে চেস্টা করে তবে এদেরও দেশের জন্য তৈরি করা যায়।
সবার প্রতি আহবান, পাশের এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষটাকে এক্টু হলেও ভাল পরামর্শ দিন,একটু সহযোগিতা করুন তবেই কিশোর গ্যাং তৈরি হবে না, না খেয়ে থাকবে না,পকেট মার হবে না। আপনি আমি সবাই নিরাপদে চলতে পারব।

জানি না ওর ভবিষ্যৎ কি,আমিও একজন মেয়ে কতকিছু ভেবে চলতে হয়,এখনো আমরা নিজেকে বৈষম্য বাদে মানুষ ভাবতে পারছি না, ও একটা বাচ্চা মেয়ে এভাবে দিন যাপন করছে। আমাদের এই পচাগলা সমাজে আরেকটু বড় হলে ও বাচবে কি করে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ও যেখানেই থাকুক ভাল থাকুক, নিরাপদে থাকুক এই কামনা।।

100% LikesVS
0% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.