শেরপুরের আদিবাসী;সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন সচেতনতা

লেখক : সোহানুর রহমান, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী।

শুরুর কথা : বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সমতল অঞ্চলে বসবাস করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৪। পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ময়মনসিংহে রয়েছে ৯টি। শেরপুর জেলাতে ৯টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। শেরপুরে যেসব আদিবাসী জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে- গারো, কোচ, হাজং, বানাই, রাজবংশী, বর্মন, ডালু, হদি এবং হরিজন। চলতি রচনাটি শেরপুরে বসবাসরত কোচ, ডালু ও বানাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়াদি সংক্ষেপে তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র।

কোচ/রাজবংশী

কোচ রাজবংশী জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত রাজবংশীরা বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ ও শেরপুরে বসবাস করে। ভারত ও নেপালেও এদের বাস রয়েছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার রাজবংশী বাস করে। সমাজ পরিচালনায় বা পরিবারে পুরুষরাই প্রধান দায়িত্ব পালন করে। পিতৃপ্রধান রাজবংশীরা পিতার পদবি ধারণ করে। পুত্র সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

সনাতন ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী রাজবংশীদের অনেকেই নিজস্ব ধর্ম পালন করে। প্রকৃতি পূজাকারীরা খরা উপলক্ষে হদুমা পূজা পালন করে থাকে। এটি তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বর্তমানে অনেকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। এছাড়াও শিব, মনসা, দূর্গা, কালী, লক্ষী, নারায়ণ, বিষ্ণু দেব-দেবীর পূজার্চনাও করে।

কোচ পুরুষেরা ধুতি ও জামা পরে। মহিলারা ফতা নামের এক ধরনের পোশাক পরিধান করে। মহিলারা চুলে, কানে, নাকে ও গলায় বিভিন্ন ধরণের অলংকার ব্যবহার করে। রাজবংশীরা পেশায় কৃষিজীবী ও মস্যজীবী। মেয়েরা কুটির শিল্পে দক্ষ। ভাত, মাছ ও শাকসবজি প্রধান খাবার হলেও বিভিন্ন বন্য প্রাণির মাংস এদের প্রিয়। বিধবা বিবাহ প্রচলিত। নিজস্ব ভাষা থাকলেও বর্ণমালা নেই। এদের ভাষার নাম কাবতাপুরী। ভারতের কোচ বিহার থেকে এই ভাষায় রাজবংশীদের ‘দোতরার ডাং’ সাময়িকী প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে রাজবংশী ভাষা একাডেমি আছে। রাজবংশীদের গোত্রগুলি হচ্ছে- কাশ্যপ, শান্তিল্য, পরাশর, ভরদ্বাজ, গেীতুম, সবর্ণ ও কপিল।

বানাই

বাংলাদেশের বিলুপ্ত প্রায় আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হচ্ছে বানাই । ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এদের বাস। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জেও এদের বাস রয়েছে। মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর অর্ন্তভূক্ত বানাইদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা অসমীয় বর্ণমালা ব্যবহার করে। বানাইরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাদের আদি দেব-দেবীর মধ্যে অন্যতম হল কামাক্ষা ও বাস্তু দেও (ভূমি রক্ষাকারী দেবতা)। তাদের অন্যান্য দেব-দেবতাদের মধ্যে পথে দেও, নিকান দেও, রাখাত দেও, কানি দেও, মুর্হলা দেও, ওর্হলা দেও, গংল দেও, চুকধাপা দেও, বন দেও অন্যতম।

পিতৃপ্রধান বানাইদের সমাজ ও পরিবার পরিচালনা করে পুরুষেরা। গ্রাম/দল প্রধানকে তারা গাত্তকুড়া বলে। তারা মায়ের পদবি ধারণ করে এবং একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ। পুরুষেরা ধুতি ও ফতুয়া পরিধান করে এবং মহিলারা আর্গণ/অগান নামক পোশাক পরে। বানাইরা পেশায় কৃষি ও শ্রমজীবী। বানাইদের প্রধান খাবার ভাত, মাছ ও শাক-সবজি এছাড়াও বন্য পশুপাখির মাংসও এরা খেয়ে থাকে।

ডালু

ইন্দো-মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত ডালু জাতির বসবাস ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও শেরপুর নালিতাবাড়ির গাছপাতি অঞ্চলের বুগাই ও কংশ নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে বসবাস করে আসছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজারের মতো ডালু বাস করে।

ডালুরা দুই ধরনের পেশায় যুক্ত- কৃষিজীবী ও শ্রমিক। ডালু পুরুষেরা ধুতি, জামা ও মহিলারা নিজেদের তাঁতে তৈরি ‘পাথালি’ নামক এক ধরনের পোশাক পরিধান করে। বাঙালির পাশাপাশি থাকায় তারা এখন শাড়ি পরে। একসময় ডালুরা মণিপুরী ভাষা ব্যবহার করলেও বর্তমানে এরা বাংলাতেই কথা বলে। ভাত, মাছ, শুঁটকি তাদের প্রধান খাবার হলেও কলার মোচা, বাঁশের কড়ল তাদের প্রিয় খাবার। শুকর, ছাগল, ভেড়া ও হাঁসের মাংসও খেয়ে থাকে। নিজেদের তৈরি পানীয় তাদের মধ্যে প্রচলিত।

ডালুরা পিতৃপ্রধান হলেও সন্তানরা মায়ের পদবি ধারণ করে। সংসার ও সমাজ পরিচালনায় পুরুষেরাই দায়িত্ব পালন করে থাকে। চিকাং, পিড়া ও যশী তাদের প্রধান গোত্র। গোত্রকে তারা দপকা বলে। এছাড়াও দরুং, নেংমা, কাড়া, মাইবাড়া, বাপার, কনা এবং শান্ধী নামে আরও ৭টি অ-প্রধান গোত্র আছে। একই গোত্রের বিবাহ ডালু সমাজে নিষিদ্ধ। সনাতন ধর্মাবলম্বী ডালুরা গৌর, নিতাই ও মনসার পূর্জা করে। এছাড়াও অনেকে আদি দেবতা কেড়েং-কুড়ি-পথ-খাওরি দেব-দেবতার পূর্জা অর্চনা করে থাকে।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.