মানুষের মন থেকে উঠে গেল সাকিব।

১৬

আবারও আলোচনায় বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান। না, এবার আর ক্রিকেট সংক্রান্ত কোনও বিতর্ক নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি লাখো মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন। কোলকাতায় তিনি কেন গিয়েছিলেন সেটি নিয়েও তৈরী হয়েছে বিভ্রান্তি। সংবাদমাধ্যম বলছে, তিনি কালী পূজা উদ্বোধন করতে গিয়েছেন। আবার সমালোচনা ও হুমকির সম্মুখীন হয়ে লাইভে এসে সাকিব বলছেন, তিনি পূজা উদ্বোধনে যাননি তবে তিনি কোন অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন সেটিও পরিষ্কার বলেন নি। লাইভে এসে ক্ষমা চেয়ছেন বিশ্বসেরা এ অলরাউন্ডার। ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ কি তিনি করেছেন? একজন বৈশ্বিক ক্রিকেটার কি কখনও নির্দিষ্ট ধর্মের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে? কেন রাখবেন? রাখলে তিনি আবার কেমন করে বিশ্বের সম্পদ হতে পারেন?

এর একদিন আগেই আমরা দেখেছি সিলেটের এক যুবক লাইভে এসে সাকিবকে খুন করতে চেয়েছে। তবে কি সাকিব সেই একজনের রামদা দেখেই ভয় পেয়েছেন? নাকি বাস্তবেই সাকিব অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেন না?

বাংলাদেশে আমরা সবাই এ মুহূর্তে একটি ক্রান্তিকাল পার করছি। ধর্মের নামে যখন তখন অনুভূতির কথা বলে যাকে তাকে আক্রমন করা হচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে একঘরে করা হচ্ছে অথচ বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। সংবিধান আমাদেরকে তেমনটাই জানায়। সাধারণ মানুষ এখন অজানা এক আশংকায় থাকে। মন খুলে কথা বলতে পারে না। ধর্মের নামে মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলছে। কারা তারা? তারা কি ধর্মের ঠিকাদারি নিয়েছে? কে ধার্মিক আর কে অধার্মিক তা নির্ধারণের মাপকাঠি কারা ঠিক করবে? ধর্মতো যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার বিষয়। তাহলে একজন সাকিব যখন কলকাতায় কোনও অনুষ্ঠানে যান তখন কেন সমালোচনা হবে? ধরেই নিলাম সাকিব পূজা উদ্বোধন করতে গিয়েছেন। সেখানে তিনি গিয়েছিলেন একজন বিশ্বতারকার পরিচয়ে। কোনও মুসলিম পরিচয়ে নয়, কারণ কেবল মুসলিম সাকিবকে এই বিশ্বের কেউ চেনেন না।

আজকে মৌলবাদীরা আমাদের জাতির পিতাকে অবমাননা করছে প্রকাশ্যে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুংকারের সাহস দেখায় তারা, অথচ আমরা দেখি রাষ্ট্র চুপ থাকে। কোনও ব্যবস্থা হয়না এর বিরুদ্ধে। সংবিধানেই বঙ্গবন্ধুর অবস্থান নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। তাহলে আজ কেন রাষ্ট্র চুপ করে থাকে। রাষ্ট্র কি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের হতে পারে? এই দেশ মুক্তির পিছনে যে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত ঝড়েছিল সেখানে কি কেবল মুসলিমরাই ছিল?

এমন হতাশাজনক অবস্থায় আমরা আশা করেছিলাম একজন সাকিব হয়তো উঠে আসবেন অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত রূপ হিসাবে। তিনি হয়তো কঠিনভাবে ঘোষণা দেবেন যে, তিনি কেবল কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, বর্ণের নয় বা কেবল এক বাংলাদেশেরই নয়। তিনি যে বৈশ্বিক সম্পদ। সাকিব চাইলেই পারতেন একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে যে বার্তায় হয়তো হুঁশ ফিরে আসতো রাজনৈতিক নেতাদেরও।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নতজানু নীতি আজ সমালোচিত। আমাদেরকে হতাশ করে দেয়। কোটি মানুষের হৃদয়ে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন লালিত আছে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। একজন সাকিবের অনেক শক্তি। তিনি তো একা ছিলেন না। গোটা বিশ্ব তার পাশে ছিল। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সাহস জোগাতে পারতেন এই বাংলাদেশকেও। হয়তো শেখ হাসিনাও এটাই চাইতেন যে তার আদরের সাকিব নিজেকে কেবল ‘মুসলিম’ পরিচয়ে আটকে রাখবেন না।

না, সাকিব তা করেন নি। উলটো তিনি মৌলবাদের আস্ফালনকে জায়েজ করেছেন নিজেকে একজন শুধুই মুসলিম দাবি করে। একজন আইডল কখনও ‘গণ্ডিবদ্ধ’ পারে না। সাকিব সেটি বুঝলেন না। তিনি চাইলেই নাড়া দিতে পারতেন, আইনের আশ্রয় নিয়ে রুখে দিতে পারতেন অন্যায়কে। যে যুবক প্রকাশ্যে তাকে খুনের হুমকি দিল সেটি কি কোন মুসলিমের কাজ? সাকিব চাইলেই সেই যুবকের মত লাখো যুবকের জন্য মেসেজ দিতে পারতেন যে ইসলাম শান্তির ধর্ম সেখানে খুনোখুনির কোনও স্থান নেই। একজন প্রকৃতি মুসলিম কখনও অন্য ধর্মকে হেয় করে না।

হ্যাঁ, সাকিব চাইলেই পারতেন রাষ্ট্রকে একটা নাড়া দিতে বা প্রেশার ক্রিয়েট করতে । একজন সাকিব যা করতে পারে হাজারো সাধারণ মানুষও তা করতে পারে না। কিন্তু তিনি করেননি। উলটা তথ্য গোপন করে নিজের পিঠ বাঁচিয়েছেন। তিনি কি সেই অনুষ্ঠানে বিনা পয়সায় গিয়েছিলেন? সেই তথ্যটি তিনি লুকিয়েছেন। নিজেকে যদি একজন মুসলিমই দাবি করে থাকবেন, তাহলে মিথ্যার আশ্রয় নিলেন কেন? সত্যকে গোপন করে একদিকে তিনি নিজের স্বার্থকে হাসিল করেছেন আরেকদিকে ভক্তদের সরল বিশ্বাসকেও ঠকিয়েছেন।

এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে সাকিব কেবল বেড়াতেই গিয়েছিলেন। তার সফরটি ছিল পুরোপুরি বাণিজ্যিক। সাকিব একজন কমার্শিয়াল অ্যাক্টর ছাড়া আর কিছু নন। তিনি অসাম্প্রদায়িকতার বাণীকে ধারণ করেন কিনা জানিনা, কিন্তু নিজেকে কেবলি একজন মুসলিম দাবি করে সেই জায়গাটিকে অশ্রদ্ধা করেছেন।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.