মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীলফামারীর কমিউনিটি ক্লিনিক

৫২

 

শিরিন আক্তার আশা,উপজেলা প্রতিনিধি, জলঢাকা:“শেখ হাসিনার অবদান, কমিউনিটি ক্লিনিক বাচায় প্রাণ স্লোগান”সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন দেশের তৃনমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক ধারণার প্রবর্তন করেন। তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছরেই দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে তদানীন্তন মহকুমা ও থানা পর্যায়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। জাতির পিতার স্বপ্নকে আরও একধাপ এগিয়ে নেয়ার প্রয়াসে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের শুরুতেই প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে দেশব্যাপী মোট ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল জাতির পিতার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নে দেশের সর্বপ্রথম ‘গিমাডাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিক’ প্রতিষ্ঠা করে এর শুভ সূচনা এবং ২০০১ সালের মধ্যেই ১০ হাজার ৭ শত ২৩টি অবকাঠামো স্থাপনপূর্বক প্রায় ৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চালু করতে সমর্থ হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর আবার কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু করা হয়। নতুন নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে গত ১২ বছরে মোট ১৩ হাজার ৮ শত ৮১টি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে বাকি প্রায় ৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করতে অঙ্গিকারবদ্ধ ।

কমিউনিটি ক্লিনিক সরকার ও জনগণের সম্মিলিত অংশীদারিত্বমূলক একটি কার্যক্রম। গত ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন’ প্রণয়ন করা হয়। এ সকল ক্লিনিক থেকে সারা দেশের প্রান্তিক জনপদ স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাথমিক সেবাসমূহ পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসকল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ২৭ প্রকারের ঔষধ ও স্বাস্থ্য-সামগ্রী প্রদান করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা, পূর্বে ৫ শতাংশ জমিতে কমিউনিটি ক্লিনিকের অবকাঠামো নির্মাণ করা হতো, দিন দিন সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বর্তমানে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৮ শতাংশ জমিতে চার-কক্ষ বিশিষ্ট নতুন নকশার কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেসের মাধ্যমে যানা যায়, জনগণের স্বাস্থ্য-তথ্য সংগ্রহের জন্য ১০৬টি উপজেলার প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকার জন্য ৫/৭ জন করে মোট ২৪ হাজার মাল্টিপারপাস হেলথ ভলান্টিয়ার (এমএইচভি) নির্বাচন করা হয়েছে। ৯টি উপজেলার থানা পর্যায়ে স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য হেলথ আইডি প্রদান কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

সরকারের এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্য খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।স্বাস্থ্যখাতে সরকার সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এমডিজি পুরস্কার, সাউথ- এশিয়া পুরস্কার ও গ্যাভি পুরস্কার এবং ভ্যাক্সিন হিরো পুরস্কারের মত অনেক সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। যা বৈবিশ্বে দেশের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করতে সামর্থ হয়েছে। দেশের গ্রামীন জনপদে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে গেলেও চোখে পড়বে এসব দৃশ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রায় একই নকশায় তৈরি ক্লিনিক।
অন্তত মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, সাধারণ অসুখ-বিসুখে দোরগোড়ায় সহজেই প্রাথমিক সেবাটুকু পাওয়া যায় কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে। একজন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রভাইডার বা সিএইচসিপি এই কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯ থেকে ৩ টা পর্যন্ত। প্রথমে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্পটি পরিচালনা করা হলেও ২০১৮ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে এই কমিউনিটি ক্লিনিক এখন চলছে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের আওতায়। শুরুতে কমিউনিটি ক্লিনিকে ডেলিভারির ব্যবস্থা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঘরের কাছে সহজে সন্তান প্রসবের নিরাপদ স্থান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

মণিভূষণ চক্রবর্তী এসিস্ট্যান্ট হেলথ ইন্সপেক্টর( AHI) জলঢাকা।তিনি বলেন উত্তরের জনপদ নীলফামারীতেও আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে কমিউনিটি ক্লিনিক ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা।
কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রতিদিন চার লাখের বেশি মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও পুষ্টিসেবা পায়। প্রয়োজনীয় ২৭ ধরনের ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষ বিনা মূল্যে পাচ্ছে। এক কথায় গ্রামের মানুষের ঘরের দোরগোড়ায় পরম বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্লিনিকগুলো।

তিনি আরও বলেন জলঢাকা উপজেলা ১১ ইউনিয়ন সহ পৌরসভায় ৪৩ কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রাম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্বাস্থ্য সহকারীরা তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা প্রদান করছেন।তারে ধারাবাহিকতায় উপজেলা শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন ঘুঘুমারী কমিউনিটি ক্লিনিকে তৃণমূল পর্যায়ে দরিদ্র মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন কর্মরত (সিএইচসিপি) সাহাবুল আলম।

তিনি বলেন, আমার ক্লিনিকে মাতৃ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমি নিজের টাকা ব্যয় করে একজন নারী স্বাস্থ্য আপাকে নিয়ে এসে গর্ভবতী মায়েদের চেকাপ করা, নিরাপদ প্রসব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং প্রসব যাতে বাড়ীতে না করাই, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র নিয়ে যায়। আমার ক্লিনিক এর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি মাসেই ডেলিভারির জন্যে আমি প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সচেতনতা সৃষ্টির ফলে গ্রামের কেউ আর বাড়িতে সন্তান প্রসব করান না। প্রসব বেদনা শুরু হলেই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন গর্ভবতী মায়েকে নিরাপদ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকি।বর্তমান নীলফামারী জেলায় ছয়টি উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক-১৯৫ টি।

এখন স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ ঝুঁকির মধ্যে থাকতে চান না। গ্রামীণ জনগণের অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সেবা বিতরণে প্রথম স্তর হিসেবে নীলফামারীর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো যেন আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাপক সারা ফেলেছে নিরাপদ প্রসব কেন্দ্র হিসেবে।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.