বাবা ছাড়া সন্তানের বেঁচে থাকার লড়াই!

১০

আজ বাবার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।
গত বছরের এই দিনে বাবা শুধু আমাদেরকেই নয় সমন্ত পৃথিবীকেই বিদায় জানিয়ে সকল মায়াজাল ছিন্ন করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে,দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেল বাবাকে হারানোর, খুব অবাক হই যখন অনুধাবন করি একটা বছর কেটে গেল কিভাবে ??? কিভাবে বাবাকে ছাড়া একটা বছর পার করে দিলাম, কিভাবে এতটা শক্ত হয়ে গেলাম, কিভাবে প্রিয় বাবাকে ভুলে গেলাম এত সহজে।বাস্তবিক অর্থে এ ব্যস্ত পৃথিবীতে তাল মিলিয়ে চলতে হলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শক্ত হতে হয়,আমার ও তাই হয়েছে বুঝলে বাবা।

ভাবি আজকের এই দিনটাতে কি আমার কোন কমতি ছিল, কোন ভুল ছিল বাবা ?এদিনে কেনো তোমাকে হারালাম বাবা।কেন তুমি কাউকে না বলে নিজের মতো করে নিজের বিছানায় শুয়ে অতি সুন্দর ভাবে না ফিরার দেশে চলে গেলে,কি অভিমান ছিলো বাবা তোমার।সকালে সবার সাথে হাসিখুশি ছিলে,সবার সাথে কথা বলছো,ছোট ভাইকে নানা পরামর্শ দিয়েছো, সবকিছুইতো ঠিক ছিলো বাবা।এর মাঝে মধ্যদুপুরে নিজের মতো করে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় গিয়ে কোন অভিমানে একবারে চলে গেলে আমাদের রেখে।বাবা তুমি তো যেন জানতে চলে যাবে।সব কিছুইতো এমনই হলো,সুস্হসবল ভাবে যেন নিজের ইচ্ছে চলে গেলে।এমন জানলে তো তোমার সাথে মন ভরে কথা বলে নিতাম,মনের সব কথা বলে নিতাম মন খুলে।বাবা তোমাকে জড়িয়ে ধরে মনের সকল ক্লান্তি দুর করে নিতাম।কেন বাবা তুমি আমাদের না বলে চলে গেলে।এমন দিনটির জন্য আমি কখনো প্রস্তুত ছিলাম না বাবা।

মানুষকে আল্লাহ অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন। সেই অসাধারণ সুন্দর নিয়ামতের একটি সন্তানের জন্য তার মা-বাবা। বাবা সন্তানের মাথার ওপর যা স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো, সন্তানের ভালোর জন্য জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে হয় তাঁকে, আদর-শাসন আর বিশ্বস্ততার জায়গা হলো বাবা। বাবার তুলনা বাবাই। যার কল্যাণে এই পৃথিবীর রূপ, রং ও আলোর দর্শন। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। বাবাকেই আদর্শ মনে করে সন্তানেরা। বাবা সন্তানকে শেখান কীভাবে মাথা উঁচু করে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়।বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে যে মানুষটা সন্তানকে সবসময় আগলে রাখে সেই মানুষটাই ‘বাবা’। ছোটবেলার গুটি গুটি পায়ে হাঁটা, তারপর বড় হয়ে যাওয়ার প্রতিটি হোঁচটে যে মানুষটা প্রতিবার সামলে রাখে সেই হলো ‘বাবা’। অথচ এ মানুষটাই যখন থাকে না, তখন একটা সন্তানের ভেতরে ক্ষতটা যে কতখানি, সেটা বাবাহারা সন্তান ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না। পিতৃহীনতার ব্যথা থেকে মুক্তিলাভ করতে হয়তো পৃথিবীর কোনো সন্তানই পারেনি। কখনও কি পারবে?

জানি, কারও মা-বাবা চিরদিন বেঁচে থাকেন না। তবুও কাছের মানুষের চলে যাওয়ার কষ্ট কেউই মেনে নিতে পারে না। কেউ পরপারে চলে যায়, আবার কেউ বেঁচে থেকেও আর ফিরে আসে না। যে কোনো চলে যাওয়াই প্রচণ্ড বেদনার। আর সেটা যদি হয় বাবা নামক নির্ভার মানুষটি- তবে জীবনভর কষ্ট, যন্ত্রণা আর দুর্ভোগের অন্ত থাকে না যেন।

বাবা ছাড়া সন্তানের বাঁচার লড়াইটা অনেকটা নীড়হারা পাখির মতো। এই সংগ্রামটা আট দশটা সন্তানের বেড়ে ওঠা থেকে আলাদা। আহদ্মাদে ফেটে পড়া বাবার আদরের ছোট্ট সেই ছেলেটাও আজ পরিবারের গুরুদায়িত্ব নিতে শিখে গেছে। মাঝে মধ্যে অফিসে কাজের চাপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর মনে মনে বলি, ‘বাবা তুমি থাকলে আজ হয়তো সবকিছু আরেকটু সহজ হতো

আহ! আজ একটি বছর চলে গেছে। আমি বাবাহীন অসহায়। আমার পথের চার দিক তিমিরে ঘেরা। আমাকে আপন করে আর কেউ ভালোবাসে না। বাবার মতো মমত্ব নিয়ে কেউ তো আর এলোনা এ জীবনে। কেউ আর বাবার মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসে না। সবার ভালোবাসার ভণিতার মাঝে স্বার্থ কাজ করে। সবাই ভালোবাসার অভিনয় করে বিনিময়ে কিছু নিতে চায়। কিন্তু বাবা, তোমরা তো কিছু নিতে চাও না, শুধু দিতে চাও। বাবা আমার খুব আবেগী ছিলেন। আমাকে খুব শাসন করতেন। খুব আদর করতেন। পৃথিবীতে এমন কোনো ভাষা নেই, এমন কোনো সাহিত্য নেই, যা দিয়ে আমার মনের এ ক্ষতকে প্রকাশ করতে পারব। এমন কোনো সান্ত্বনার বাণী নেই, যা শুনিয়ে আমার বুকের মাঝে পাথরচাপা কষ্টগুলোকে কমানো যাবে। আমার বাবা নেই। আমার বটবৃক্ষ নেই। যে আমার জন্ম থেকে তার শীতল ছায়া দিয়ে বড় করেছে। কেউ আর বটবৃক্ষের ছায়া নিয়ে আমার পাশে দাঁড়াবে না। কেউ না।

আমার বাবা একজন ভালো ও নীতি–আদর্শবান ছিলেন। তিনি ছিলেন বললে ভুল হবে, তিনি এখনো আমাদের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে থাকেন, এটা আমার অনুভব, আমার বিশ্বাস। আমার জন্ম ও শিক্ষাজীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত। চলার পথে, কি পারিবারিক জীবন ক্ষেত্রে, চাকরি জীবন ক্ষেত্রে বাবা তার মেধা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাকে তাঁর প্রশস্তবুকে আগলে রেখেছিলেন। এখন কোনো বিপদে দিশেহারা হয়ে পড়ি। অভিভাবকহীনতার কষ্টে ভুগি। কারও পরামর্শ চাইলে শুনতে হয়, ‘দেখো, তুমি অনেক বড় হয়েছ , শিক্ষিত, আমাদের চেয়ে ভালো বোঝো, যা ভালো মনে করো, তা–ই করো।’ এখন কেউ বলার নেই, থাম, আমি দেখছি, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ, সব ঠিক হয়ে যাবে, নিজে ভালো তো জগৎ ভালো- নিজে ভালো থাকলে, ঠিক থাকলে, সবই ভালো থাকে বা হয়। মাথায় স্নেহের হাত বুলানোর কেউ নেই।বাবা থাকতে মনে হতো না আমি বড় হয়েছি, মনে হতো এখনো ছোট আছি। এখন মনে হয় বয়স হয়েছে, নিজেরই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাবা হারানোর ব্যথা বা বাবাহীন জীবনের কষ্ট ভয়ানক। যে বাবা হারায়নি, সে এই ব্যথা বুঝবে না। আমার বাবা অনেক সময় আমাকে বলতেন, তুমি খুব আবেগপ্রবণ, বাস্তববাদী না, ঠিক সময় ঠিক কাজ করতে পারি না, যার কারণে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। তাই মাঝেমধ্যে বকা শুনতে হতো।

বাবা আমাদের জন্য তাঁর আদর্শ রেখে গেছেন। না, আদর্শ মানে গালভরা কিছু নয়। সামান্য নিয়েও সততার শক্তিতে আর ভালোবাসায় কীভাবে সবকিছু কানায় কানায় ভরিয়ে রাখা যায়, এ শিক্ষা তো দিয়ে গেছেন। ছোট্ট একটা জীবন আনন্দময় করার জন্য সততার চেয়ে বড় আদর্শ আর কী হতে পারে।

বাবা, আজ তুমি নেই, আজ তুমি ছাড়া আমরা যে কী অসহায়, তা বুঝতে ভুল হয় না একটিবার। তুমি ছিলে আমাদের প্রাণ আর আমিও ছিলাম তোমার প্রাণ। আল্লাহ, আমার বাবার সব পাপ মাফ করো, কবরের আজাব মাফ করো, তার রুহের শান্তি দাও, তাকে জান্নাতুলফেরদাউস দাও ।

লেখকঃ-
ইন্জিনিয়ার মোঃ নুর আলম সিদ্দিকী

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.