তরিকুল ইসলাম স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু এ সরকার দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে: বিএনপি

২৫

✍ বাবুল তালুকদার : বিএনপির মহাসচিব মির্জা আলমগীর বলেন, তরিকুল ইসলাম সাহেব একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে আমরা মন খুলে কথা বলতে পারবো, নিরাপদে নিশ্চিন্তে চলাচল করতে পারবো, আমাদের মায়েরা, মেয়েরা, বোনেরা যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় নিরাপদে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবেন। কৃষক তার কৃষির ন্যায্য মূল্য পাবে। শিক্ষার্থী তার শিক্ষার অধিকার পাবে। ১৯৭১ সালে যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। দুর্ভাগ্য আমাদের সেই স্বপ্ন বাংলাদেশে এখনো পূরণ হয়নি। আমাদের মূল যে চেতনা ছিলো, গণতান্ত্রিক চেতনা তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে এই আওয়ামী লীগ সরকার।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের স্মরণে এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘‘ আজকে কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে তারা (সরকার) ? আপনারা দেখবেন যে, দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বি হয়েছে। প্রত্যেকটা জিনিসের দাম তিন-চারগুন-পাঁচ গুন হয়ে গেছে। কাদের জন্যে? তাদের লুটপাটের জন্যে। তারা সিন্ডিকেট তৈরি করছে, সিন্ডিকেট তৈরি করে তারা সব মুনাফা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন,‘‘ বেতন বাড়াচ্ছেন কাদের? সরকারি কর্মকর্তাদের। তিনগুন-চারগুন বেতন বাড়ি্য়ে্ছেন। আর আমার কৃষক ভাইয়ের কী আয় বেড়েছে, শ্রমিক ভাইয়ের কী আয় বেড়েছে, আমাদের যারা ক্ষুদে ব্যবসায়ী তাদের কী আয় বেড়েছে? এই করোনাতে তারা প্রায় নিঃস্ব অবস্থা হযে গেছে। বহু মানুষ আছে যারা দুই বেলা খেতে পায় না। আজকে সেই অবস্থা আপনারা তৈরি করেছে। আপনারা এখানকার মানুষগুলোকে জিম্মি করে ফেলেছেন এবং তাদের আপনারাই অন্ধকারের দিকে ঠে্লে দিচ্ছেন।”
জিডিপির প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘ ওদের (সরকার) খারাপ লেগেছে আমি বলেছিলাম যে, আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন উন্নয়নের কথা বলে জিডিপি সম্পর্কে ..। খারাপ লাগার তো কিছু নেই- দ্যাস এ রিয়েলিটি। আপনারা যেকোনো অর্থনীতিবিদের কাছে যাবেন যিনি নিরপেক্ষ, আপনাদের উচ্ছিষ্টভোগী নয় তাদের কাছে যাবেন তারা আপনাকে বুঝিয়ে বলে দেবেন।”
‘‘ দরকার নেই। আপনি যেকোনো কৃষকের কাছে যান, আপনি রিকসা ভাই, শ্রমিক ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন যে, তারা কেমন আছেন? তার কোন উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে আপনাদের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদে্শে পাঁচার করেছেন।স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন ড্রাইভারের নাকী ৫‘শ/৬‘শ/৭শ‘/৮‘শ কোটি টাকা। কল্পনা করা যায় না! এই বাংলাদেশের যার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, আমরা লড়াই করেছি, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি সেই বাংলাদেশের আজকে এই অবস্থা এই পরিণতি।”

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘‘ আপনাদেরকে অনুরোধ করব, আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হই আমরা, আমরা নিজেরা পরস্পর পরস্পরকে বুঝার চেষ্টা করি,ভালোবাসার চেষ্টা করি, ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করি। সেই সাথে সমস্ত মানুষকে যেন একখানে আনতে পারি, সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে যেন এক খানে আনতে পারি। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে গনতন্ত্রের যে আন্দোলন সেটাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে যেন এই দানব আওয়ামী লীগ সরকারকে পরাজিত করতে পারি তাহলেই কিন্তু হবে তরিকুল ইসলামের আত্মার প্রতি পূর্ণ মর্যাদা।”
‘‘ আসুন আজকে আমাদের নেত্রী অন্তরীন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়া্রম্যান তারেক রহমান এই সরকারের মিথ্যা মামলার কারণে নির্বাসিত হয়ে আছেন, আমাদের ৩৫ লক্ষ-লক্ষ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী পালিয়ে আছে- একটা দুঃসহ অবস্থা । সেখান থেকে উত্তরণে জন্য আমরাদের এখন একমাত্র প্রয়োজন হচ্ছে ঐক্য ঐক্য ঐক্য এবং জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়েই আমরা অবশ্য্ই এই দানবীয় সরকারকে পরাজিত করতে সক্ষম হবো এবং গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো ইনশাল্লাহ।”
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক প্রত্যেকদিন কথা বলেন এবং তার অত্যন্ত সুবেশী মানুষ। চমতকার একটা ঘরের মধ্যে চমতকার, একটা আসনের মধ্যে খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আমি শুনেছি তিনি ছাত্র জীবনে নাটক করতেন। আমিও নাটক করেছি একসময় এবং উনি সুন্দর করেই বলেন। একটাই বক্তব্য, প্রতিপাদ্য একটাই যে, বিএনপির এই নাই. বিএনপির ওই নাই-এসব বলছেন।”
‘‘ বিএনপি তো উনাদের কাছে নাই, উনারা বলছেন বিএনপি নাকি সংকটে পড়েছে, বিএনপিতে অন্ধকার। তাহলে মুখে সারাক্ষন বিএনপি কেনো? আমার প্রশ্ন ওই জায়গায়। আপনার মু্খে এতো আলো কেনো বিএনপির? কারণ আপনারা জানেন যে, বিএনপি হচ্ছে একমাত্র দল যে রাজনৈতিক দলটি গণতন্ত্র আনতে পারে, অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে। আপনারা যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন তার অবসান করতে পারে।”
তিনি বলেন, ‘‘ আপনারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আটক করে রেখে দিয়েছেন মিথ্যা মামলা দিয়ে। কেনো করেছেন? এজন্য করে্ছেন যে, আপনারা জানেন যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যদি বাইরে থাকেন, নির্বাচনের পূর্বে সেটা করেছেন সেটাও কোনো মতে সম্ভব ছিলো। তারপরে এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যদি বাইরে থাকতেন… । সেই কারণে আপনারা তাকে আটকিয়ে রেখে দিয়েছেন।”
‘‘ আজকে ৩৫ লক্ষ মানু্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এক লক্ষ মামলা। আমাদের নেতা-কর্মী গুম করে দিয়েছেন, হত্যা করেছেন তারপরেও কিন্তু বিএনপি থেকে একটা লোককেও টেনে নিয়ে যেতে পারেননি। বিএনপির এই জায়গায় পৌঁছানো এর পেছনে তরিকুল ইসলাম সাহেবদের অবদান। আজকে যে সংকট এই সংকট আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করেছে। তারা তাদের একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করবার জন্যে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দি্য়েছে এবং মানুষের ভোট দেয়ার অধিকার সেটা পর্যন্ত তারা লুটে নিয়েছে।।”
সভাপতির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘‘ তরিকুল ইসলাম কিশোরকাল থেকেই প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতেন, আগাগোড়া একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিশ্বাসী ছিলেন। সেই কারণে তিনি সর্বমহলের সর্বজনের মধ্যে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আস্থাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।”
‘‘ তরিকুল ইসলাম ঢাকায় চলে আসতেন আগেই। তিনি পথে-প্রান্তরে বিভিন্ন শ্রেনীর নেতা-কর্মীদের সাথে মিছিল-মিটিং যোগ দিতেন। অর্থাত জনমুখী বা গণমুখী হতে হলে রাজনীতির যে কর্মসূচি পালনের মধ্যে যদি আমরা পথে না চলি, পথের সাথে না থাকি তাহলে পথ খুঁজে পাবো না। আজকে সেই কারণেই বলব, তরিকুল ইসলামের আদর্শ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমিও তার জীবনের অনেক কিছু অনুসরণ করার চেষ্টা করি।”
প্রয়াত তরিকুল ইসলামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তরিকুল ইসলাম স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে এই স্মরনসভা অনুষ্ঠিত হয় ।
২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর অ্যাপেলো হাসপাতা্লে চিকিতসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবেক মন্ত্রী, সাংসদ ও জননেতা তরিকুল ইসলাম। বুধবার যশোরে মরহুমের কবরে পুস্পমাল্য অর্পন, কুলখানিসহ দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে স্মরণ করেছেন দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে ও সহ-প্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীমের পরিচালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মশিউর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন কেন্দ্রীয় নেতা জয়ন্ত কুমার কুন্ড, অমলেন্দু দাস অপু, অঙ্গসংগঠনের মোস্তাফিজরুর রহমান, আবদুল কালাম আজাদ, হাফিজুর রহমান, আমিনুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় বিএনপির হাবিব উন নবী খান সোহেল, মোশাররফ হোসেন, সেলিমুজ্জমান সেলিম, হারুনুর রশীদ, অপর্না রায়, নেওয়াজ হালিমা আরলি, ফরিদা ইয়াসমীন, তাইফুল ইসলাম টিপু, প্রকৌশলী টিএস আইয়ুব, নিপুণ রায় চৌধুরী, মীর রবিউল ইসলাম লাভলু, খান রবিউল ইসলাম রবি, নাজিউদ্দিন মাস্টার, সাবেরা ইসলাম মুন্নী, শেখ রবিউল আলম, আমিরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, নুরুল হুদা নুরু, প্রয়াত নেতার ছোট ছেলে দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.