গল্প: চিলেকোঠা

১৪৬

লেখক: ফাহিম আল মামুন।

এক জোছনা বহুল রাতে
সেই চিলেকোঠার পাশে
স্নিগ্ধ বাতাসের অনুভুতি নিয়ে
তোমার পাশে বসে
তোমার সান্নিধ্যে থাকবে শুধু আমার বিচরন,
আমি একলা পথের মানুষ,
তাই তোমারই একজন।

ক্লান্ত শরীরে কাধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে যখন অফিস থেকে বের হই তখন আর দিনের আলো থাকে না। চাইলেই পারি বিকেলের আলোয় নিজেকে একটু প্রশান্তি দিতে কিন্তু দেওয়া হয় না। ভয় হয়। নিজের একাকিত্ব কে আর উপভোগ করতে পারি না। সন্ধায় অফিস থেকে হেঁটে ফেরাটা একটা অভ্যেসে পরিনত হয়েছে৷ একটু দুরে হলেও হেঁটেই আসি তবে মাঝে মাঝে রিকশায়। তবে একটি হাত দিয়ে ব্যাগটা ধরে থাকি। তোমার হাত ধরে হাঁটার বা রিকশায় বসার অভ্যেসটা রয়ে গেছে তাই আরকি৷

তুমি বা আমি কেউই কি জানি আমাদের মাঝের সম্পর্কটা কি ছিলো? আমাদের কখনও প্রেম হয়নি তবে কিছুতো একটা ছিলো যেকারনে দুজনেই একে অপরের সাথে থাকতাম। মিশে ফেলতাম দুজন দুজনকে চোখের দৃষ্টিতে। কি মাতাল এক টানে আবদ্ধ ছিলাম দুজনে আমরা। তবুও বলছি, আমাদের কখনও প্রেম হয়নি।

আচ্ছা নওশিন, তোমার কি মনে আছে আমাদের প্রথম দেখার কথা? মনে আছে তুমি বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছিলে আর আমি পাতলা একটা কম্বল তোমায় জড়িয়ে দিয়েছিলাম। পেছন ফিরে খুব রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলে অথচ আমার দিকে তাকিয়েই কেমন যেনো শান্ত হয়ে গেলে। আমিও ভাবিনি তুমি ইচ্ছে করেই এমনভাবে বৃষ্টিতে ভিজবে৷ তোমায় কিছু বলতে না পেরে মুখ নিচু করে বলেছিলাম,
‘আপনি বৃষ্টিতে কাঁপছিলেন তাই কম্বল দিলাম।‘
তুমি হেসে দিয়ে বলেছিলে,
“কাঁপছিলাম দেখে কম্বল দিলেন কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজছি তাহলে ছাতা দিতেন?”

আমি কিছু বলিনি আর। আমার কাছে ছাতা ছিল না বলে। কিন্তু তুমি আমায় দেখে হাসছিলে আর আমি কাঁপছিলাম বৃষ্টিতে ভিজে। এখন কি করার? সাজেকের এই মেঘদৃশ্য দেখতে এসে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে ভাবিনি। তবে একটু ঠান্ডায় চাদর নিয়ে না আসায় হোটেলের কম্বল নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিলাম। আর এখন এই অপারগতা নিজেকে নিয়ে। আচ্ছা আমি কি জানতাম তোমার সাথে আমার দেখা হবে? তবে কেনো এতো দ্বিধাবোধ?

সেদিন আমার মাঝে কিছু নতুনত্ব দেখা দিলো। বৃষ্টি শেষে কংলাগ পাহাড় থেকে ফেরার পথে তুমি কম্বলটি আমায় দিলে। কপালে লেপ্টে যাওয়া চুলটা হাত দিয়ে আঁচড়ে দিলে। কেনো দিয়েছিলে? প্রথম কোন নারী অনুভুতি আমার মাঝে শিহরিত হলো। বৃষ্টিতে ভেজা তোমার ওই ঠোঁটে একটু খানি ছুয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো আমার। আবারও বলছি, ওটাই আমার প্রথমবার কাউকে নিয়ে নিজের ভাবনা ছিলো। পথ শেষে কি বলেছিলে মনে আছে কি? বলেছিলে,

পরেরবার এরকম বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে অপেক্ষা করতে। আরও বলেছিলে, এই বৃষ্টি তোমার অনেক পছন্দের। আর কথা হয় নি। তখন সেরকম কিছু মনে না হলেও হোটেলে এসে তুমি ছাড়া আর কিছুই যেনো চিন্তায় নেই। মনে হচ্ছিলো বারবার বলি, তুমি কি আমার হবে মেয়ে? হয়ে যাও না আমার, আমি শীতবিলাসে তোমার চাদর হয়ে পাশে থাকবো। জোছনা রাতে নিরিবিলি ছাদে তোমার মাথা রাখার কাঁধ হয়ে আবার কখনও তোমার মৃদু বিরক্তহীন মুখে একটুখানি হাসির কৌতুক হয়ে তোমার হাসির কোনে লেগে থাকতে চাই। খুব বেশি কি খারাপ হবে এতে? কিন্তু বলা হয় নি। ওই যে, আমাদের কখনও প্রেম ছিলো না।

এরপর পেরিয়ে গেছে তিন থেকে চার মাসের মতো। তোমার দেখা পাই নি আর। এতোদিনে অনুভবেও একটু ঝাপসা হয়ে গেছো তুমি। তবে মরিচিকা এবার সত্যি হয়ে গেলো। অনিচ্ছা থাকা সত্যেও এক বন্ধুর সাথে এসেছিলাম তিন ঘন্টা জ্যামে আটকে থেকে টিএসসির বইমেলাতে। এলোমেলো হয়ে যখন এদিক ওদিক ঘুরছি তখন চোখ আটকে গেলো এক তরুণীর সবুজ শাড়িতে। হাতের কাজ করা সেই শাড়ির পাড়ে কি ছিল জানিনা তবে ওই তরুণীর চোখ দেখে বুঝেছিলাম তুমি হারিয়ে যাওনি অথবা তোমাকে পেয়েছি আমি। পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যখন বললাম,
‘আজ বৃষ্টি নেই তবে রৌদ্রস্নাত আলোর বৃষ্টিতে তোমাকে আবারও পেয়ে গেছি।’
পেছন ফিরে আমাকে দেখে তুমি কেনো যেনো অবাক হলে না। মৃদু হেসে বললে,
“মানুষ তাকেই হারিয়ে ফেলে যাকে মনের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় না। তুমিতো হারিয়ে যাও নি তবে সময় একটু পৃথক অবস্থান চেয়েছিল হয়তো। তবে এই পৃথক অবস্থান হয়তো ভালোই কিছুর প্রেক্ষিতেই। এই দেখো না, দ্বিতীয়বার দেখাতেই আমরা আপনি থেকে তুমির কাতারে এসে পরেছি।”

আমি ভেবেছিলাম তুমি অবাক হবে, যেমনটা আমি হয়েছিলাম। বোঝাতে পারবো না তোমায় দেখতে পেয়ে কতটা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমার গালে হাতটা রেখে মৃদু হেসে বলছিলে,
“কেমন আছে অভিমানী রাজ্যের নায়কটা?”
আমার শরীর তোমার হাতের ছোয়ায় আবারও শিহরিত হলো৷ নিজের হাত দিয়ে তোমার হাতটা আমার গালেই চেপে রাখি। দেখতে থাকি তোমার প্রানবন্ত সেই হাসিটা। কিভাবে পারতে তুমি, এতো মায়া ছড়াতে? হাতটা নামিয়ে পাঁচ আঙ্গুলের মাঝে বন্দী করে নিলে আমায়। বললে,
“বই পড়তে ভালোলাগে?”

আমি তখনও ভাবছি আমাদের মাঝে কি প্রেম হয়ে গেছে? কিভাবে এতো সহজেই সবকিছু হয়ে গেলো? আমিতো ভেবেছিলাম আরও হয়তো সময় লাগবে।
মৃদু স্বরে বললাম, ‘আচ্ছা আমাদের মাঝে কি প্রেম হয়ে গেছে?’
খুব মজার কিছু বলে ফেলেছিলাম হয়তো তাই তুমি প্রানখুলে হেসেছিলে। এরপর বললে,
“প্রেম হয়ে গেছে বললেই কি প্রেম হয়ে যায়? এমন প্রেমের কি কোন মানে আছে বলো?”
আমি কিছু বলতে পারিনি। নিজের মাঝেই যতো দ্বিধাবোধ আকড়ে ছিলো। কিছু বুঝতে না পেরে তোমার নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছিলে,
“নাম জানাটা কি খুব বেশি জরুরী? তুমি নাহয় তোমার মনের মতো একটা নাম দিয়ে দাও যেটাতে তুমি আমাকে ডাকতে চাও।”
এটা শুনে আমি আবারও দ্বিধায় পরে গেলাম। তুমি এই দ্বিধায় ভরা আমার চেহারাটাকে দেখে অনেক মজা পাচ্ছো এটা বুঝতে পারছি। এর একটু পরেই আমাকে টেনে একটা বইয়ের দোকানে এনে বললে,
“দেখো তো কোন বইটা নিব। আমি না বুঝতেই পারছি না।”

আমি তোমায় কিছু বলতে পারছিলাম না। কারন এসব বই পড়াতে আমি অভ্যস্ত নই। মাথা নিচু করে বিভিন্ন বইয়ের দিকে তাকাতেই তুমি আমার মুখের সামনে চলে এলে৷ আমি তোমার দিকে তাকিয়ে আবারও মাথা নিচু করে বললাম,
‘আমি গল্পের বই পড়াতে অভ্যস্ত নই। তাই জানিনা কোনটা নিতে বলবো তোমায়।’
তুমি হাসলে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে আমার হাত ধরে টিএসসির মোড়ে নিয়ে এলে। আমি তোমায় বললাম আমার সাথে আসা বন্ধুর কথা৷ তুমি শুধু বললে,

“নিজেকে একটু অগোছালো ভাবে স্বাধীন করেই দেখো না, সবকিছুই তোমার জন্য সাজানো, এমনটাই মনে হবে। আর তাছাড়া আজ তোমাকে হিমুর গল্পে সাজাবো। আমার জন্য এটুকু পারবে না করতে?”

আমি হাসলাম। মনে মনে ভাবছি, তুমিই আমার প্রথম কেউ যাকে আমি ভালবাসতে চেয়েছি। তোমার জন্য এটুকু কেনো, আরও অনেক বড় কিছু করতে রাজি আছি। তোমার চোখের দিকে চেয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলেছিলাম। তুমি আমার ভোঁতা নাকটা টেনে দিয়ে বললে, চলো।

হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেত চলে এলাম। পুরনো হলেও গুনে গুনে প্রায় একুশটা বই কিনে দিলে। মুখের সামনে বারবার চলে আসা চুলগুলো কানে সুন্দর করে গুঁজে দিলে। খুবই ব্যস্ত হয়ে গেলে আমাকে হিমু সমগ্রের ধারা বোঝাতে। আর আমি তাকিয়ে দেখছি ব্যস্ততায় ভরা তোমার মুখের ভঙ্গিগুলো। একসময় তুমি থেমে গিয়ে আমার দিকে তাকালে। মৃদু হেসে বললে,
“এভাবে তাকিয়ে আছো যে? আমাকে কি শেষ দেখছো আজ? এতোক্ষন কি বলেছি বুঝেছো কিছু?”

আমি মাথা চুলকোনোর ছুতোয় এদিক ওদিক তাকাতেই তুমি আবারও হেসে ফেললে। মাথায় একটু টোকা মেরে বললে, পাগল।

অথচ সেদিন তোমার সাথে কাটানো সময় গুলো যেনো অনেকটা স্বপ্নের মতো ছিলো। আমার মনের প্রশ্নগুলো কেমন যেনো অজানাই রয়ে গেলো। খুব ইচ্ছে ছিল তুমি কোথায় থাকো, কি করো এসব জানার। কিন্তু কিভাবে যেনো এসবও ভুলে গেলাম। বাসায় ফিরে এই বোকামির জন্য অনেক আফসোস হতে লাগলো। কিনে দেওয়া বইগুলোর মধ্যে হিমু সিরিজের প্রথম বই ময়ুরাক্ষী পড়তে ধরলেও মন বসাতে পারলাম না। কোনভাবে রাতটা পার করে পরেরদিন সকালেই চলে গেলাম টিএসসির মোড়ে। চায়ের দোকানগুলোতে তখন নাস্তার জন্য সোরগোল চলছে। কিন্তু আমি এদিক ওদিক তোমার একটু দেখা পাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। মনে হয় তোমার আসার কথা ছিলো। কিন্তু তুমি আসবে কি না সেটাও আমি জানি না। ঘন্টাখানেক এভাবে কেটে গেলে নিজের বোকামির জন্য আবারও মনে হলো তোমায় হারিয়ে ফেললাম। হাতে ময়ূরাক্ষী নিয়ে মাথা নিচু করে নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছি যে কিভাবে এই ভুলটা আমি করি? অন্তত তোমার নাম্বারটা তো নিতে পারতাম। কিন্তু তখনি তুমি পাশে বসে বললে,
“ঘুমাতে পারোনি রাতে তাই না? জানও, আমিও পারিনি সেদিন রাতে, যেদিন হিমুর দ্বিতীয় প্রহর বইটি মেলায় এসেছিলো অথচ আমি পরেরদিনে বইমেলায় যাবো। সারাটা রাত খুব অস্থিরতায় কাটিয়েছিলাম।”

আমি মাথা উঠিয়ে অস্থিরভাবে তোমার দিকে তাকালাম। তুমি মিটিমিটি হাসছিলে।

একটু শান্ত হয়ে বললাম,
‘তোমার মাথায় কি আমার জন্য একটুও অস্থিরতা কাজ করে না? জানো আমি ভেবেছিলাম তোমাকে-
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তুমি বললে, “আমাকে আবারও হারিয়ে ফেলেছো তাই তো? এমনটা কখনও ভাববে আজ থেকে। আমি সবসময় তোমার পাশে আছি যেমনটা হিমুর পাশে রয়েছে রুপা।”
আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
‘এই রুপা আবার কে?’
মেকি রাগ দেখিয়ে তুমি বললে,
“তুমি বই পড়নি? আমি তো ভেবেছি তুমি দুই একটা বই পড়ে শেষ করে ফেলবে। কতদুর পড়েছো?”
আমি মৃদু শব্দে বলি,
‘প্রথম দুই পৃষ্ঠা। লেখকের কিছু কথা আর প্রথম পৃষ্ঠার কিছু আজগোবি লিখা।’

এটা শুনে তুমি আমার দিক থেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলে। আমি তোমার হাতটা ধরে বললাম, ‘কাল রাতে চিন্তায় কোন কিছুতে মন বসাতে পারছিলাম না। তাই পড়া হয়নি। তোমাকে হারানের খুব ভয় হয় আমার। কিছুই তো জানিনা তোমার সমন্ধে তাই ভয়টা আরও বেশি ছিলো।’

তুমি আমার দিকে তাকালে। নিচু করা মাথাটা উপরে উঠিয়ে আমার দিকে তাকাতেই হেসে ফেললে। আমি কেনো যেনো তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না৷ এদিক ওদিক তাকাতেই তুমি বললে,
“এই আমার চোখের দিকে তাকাও। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখো তো আমার চোখটা কি বলে?”
আমি কি এক অদ্ভুত কারনে তোমার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তুমি এটা দেখেই হাসছিলে৷ এরপর আমার পকেট থেকে ফোনটা বের করে তোমার ফোনে ফোন দিলে। নামবারটা সেভ করে দিলে নওশিন নামে। আমিও তোমার নাম্বারটা সেভ করে দিয়েছিলাম মামুন নামে। একসাথে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। তারপর তুমি একে একে তোমার ব্যাপারে বললে। আমিও বললাম কিছু কিছু। সত্যি বলতে তোমার হাত ধরে হাঁটতে অদ্ভুত এক ভালোলাগা বিরাজ করছিলো। মনে হচ্ছিলো আমার হাতটিকে অনেক ভরসার হাত মনে করে ধরে রেখেছো আর আমি এমন একটি হাত ধরেছি যেই হাতটিকে আমি ছাড়তে চাই না কোন কিছুর বিনিময়েই, পরম ভালবাসা আর মায়ায় জড়িয়ে রাখতে চাই সারাজীবন।

এরকম ভাবেই কাটতে লাগলো দিন। আমার ইতিহাস পছন্দ অথচ তোমার রসায়ন পছন্দ। তুমি বই পড়তে ভালবাসো অথচ আমি সিনেমা দেখতে ভালবাসি। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি, কিভাবে যেনো তুমি সবকিছুই ধরে রেখেছিলে। কোথাও ঘুরতে গেলে সেটা সবসময় কোন ঐতিহাসিক স্থান হবে। আবার ঘুরতে যেতে যেতে তোমাকে হিমুর গল্প শোনাতে হতো। আমি যখন তোমাকে অ্যান্টনি আর ক্লিওপেট্রার সিনেমাতে অদ্ভুত ভালবাসার কথা বলতাম, তুমি তখন সোডিয়াম ক্লোরাইড নয়তো ইলেকট্রোপ্লেটিং এর বন্ধনের মতো আমাদের ভালবাসার দৃঢ়তা মেলাতে। সবকিছু মিলিয়ে কি সুন্দর এক সামঞ্জস্য ধরে রেখেছিলে।

বানিজ্য মেলায় তোমায় একদিন নীল শাড়ি পরে আসতে বলেছিলাম। আমি সেদিন হলুদ পান্জাবীতে গেলে তোমায় দেখি সালোয়ার কামিজে। মৃদু রাগ করে বলেছিলাম,
‘কেনো শাড়ি পরে আসলে না?
আমার নাকটা টেনে দিয়ে বলেছিলে,
“আমি নীল শাড়িতে তোমার রুপা হয়ে দুরে দুরে নয় বরং সারাটাক্ষন তোমার পাশে থাকতে চাই।”

কথাটা শোনার পর কি কেউ রেগে থাকতে পারে? কথা বানানো কেউ তোমার থেকে শিখুক। তোমার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত খুব বেশিই ভাল কাটতো। মাঝে মাঝেই মনে হতো এতোটা সুখ হঠাৎ করে কিভাবে পেলাম আমি?

সেদিন তোমায় দিয়েছিলাম কিছু তাজা কৃষ্ণচূড়া
মৃদু রোদটাও চেয়েছে তোমার মিস্টি মুখে উঁকি দিতে
ইতিহাসের প্রেম গুলোও হয়তো চেয়েছে প্রেক্ষাপটে
ফিসফিস শব্দে হয়তো কানে কানে বলেছিলো কেউ
ভালবাসি, ওই মিস্টি মুখের মায়া ছড়ানো হাসিটাকে
ভালবাসি, ওই ক্লান্ত মাথা রাখার কাঁধ বালিশ হতে

প্রেমে পরেছি মেয়ে, ভালবাসতে চাই শুধুই তোমাকে।

সময় পেরিয়ে গেছে। বেড়ে চলেছে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা। কখনও ভাবিনি তুমি হারিয়ে গেলে কি হবে আমার? তোমাকে হারানোর ভয়টাও যে হারিয়ে বসেছি তোমার ভালবাসা পেয়ে। তবে ভয় তো লুকিয়ে থাকে না। সামনে এসে জাগিয়ে তোলে।

ঐদিনের কথা আমার আজও মনে আছে। তুমি আমি একসাথেই বৈশাখী সাজের জন্য কেনাকাটা করেছিলাম। কথা ছিলো পরেরদিন একসাথে ঘুরে বেড়াবো আমরা। মাতিয়ে তুলবো নিজেদের রমনা বটমুলের গানের আসরে আর পান্তা-ইলিশের ঝাঁঝালো গন্ধে। কিন্তু হলো না কিছুই। সেদিন সকালে ভিড় ঠেলে রমনা বটমুলে এসে অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও পাইনি তোমায়। ফোন দিয়েও সারা পাইনি। বিকেলে তোমার বাসার সামনে গেলেও তোমরা বাসায় কেউ ছিলে না। রাতারাতি কি হলো কে জানে। বাসার দারওয়ান কে জিজ্ঞেস করলে বলে তোমরা কালই নাকি বাসা ছেড়ে দিয়েছো। কোথায় গিয়েছো কেউই বলতে পারছে না। আমি তখনও ভেবে উঠতে পারিনি যে আমি আবারও হারিয়ে ফেলেছি তোমায়। ভেবেছিলাম, তুমি ফোন দিয়ে সবকিছু জানাবে। কিন্তু না, সেটাও আর হলো না। হয়তো কারন একটাই, আমাদের সম্পর্কটা প্রেম ছিলো না।

পূর্বের ন্যায় আবারও আমি অপেক্ষায় থেকে গেলাম তোমার। কিন্তু রহস্যময়ী তুমি এবার রহস্য নিয়ে ফিরে এলে না। তুমি আমার কতটা জুড়ে ছিলে সেটা তুমি না গেলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। আমি আবারও গোছালো হয়ে গেলাম৷ আবারও শুরু হলো একলা পথের চলমান সেই সময়ের ধারার পথিক হয়ে। শুধু উড়ে গিয়েছিলো জীবনের উৎফুল্লতা। মুছে গিয়েছিলো মুখের হাসিটা। ঘরের কোনে আবদ্ধ হয়ে পরে থাকা মানুষটার জিবনে নেমে এসেছিল এক শেষ না হওয়া সন্ধ্যা।

এভাবে আমার জিবন হয়তো চলেই যাচ্ছিলো তবে যাচ্ছিলো না আমার পাশে থাকা মানুষ গুলোর। আমার মা মুখ লুকিয়ে কাঁদে জানো। ঘরে এসেই একদিন আমায় জড়িয়ে নিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলো। বারবার বলছিলো, কি হয়েছে আমার ছেলেটার? ছেলেটার মনের কষ্টটা কি এতই বড় যে মা’কে বলা যাবে না? ছেলেটা কি মায়ের উপর রাগ করেছে? মা কি কোন ভুল করেছে, বল বাবা?

সেদিন মা’কে জড়িয়ে আমিও কেঁদেছিলাম মৃদু শব্দে। উপলব্ধি করেছিলাম জীবনে কিছু মানুষের মুখের দিকে তাকিয়েও হয়তো ভালো থাকতে হয়। ছেলের এরকম অবস্থা দেখে এক মায়ের যা কষ্ট হয় তা নিশ্চয়ই আমার কষ্টের থেকে ছোট নয়। শুরু করলাম নিজের জীবনযাত্রা পাশের মানুষগুলোকে ভালো রাখার উদ্দেশ্যে। বাসার চিলেকোঠাকে বানিয়ে দিলাম ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি। তোমার দেওয়া বইগুলো সাজিয়ে রাখলাম। অনেক বই হয়ে গেছে। তুমিতো বই দিতে আমায় সবসময়। বই পড়ার অভ্যেসটাও অবশ্য তোমার করে দেওয়া।

সবি হচ্ছে শুধু কাটছেনা রাতের নিস্তব্ধতা। চিলেকোঠায় বসে তোমার দেওয়া বই গুলো বারবার পড়ি৷ তোমায় কিছু বলতে ইচ্ছে হলে সাদা পৃষ্ঠায় লিখে রাখি। লুকিয়ে রাখি সেই চিঠিগুলোকে তোমার দেওয়া বইগুলোর ভেতরে। যদি কোনদিন তুমি ফিরে আসো তবে দেখবে কতটা ভালবাসা নিয়ে আকড়ে রেখেছি তোমায়। তুমি শুধু একটিবার ফিরে এসো।

তোমার সাথে কখনই আমি কোন রেষ্টুরেন্টে বসে গল্প করতে পারিনি। ক্ষিদে পেলে হয়তো খেয়েছি তবে তোমার জন্য বসে থাকা হতো না। তোমার সবসময় খোলামেলা জায়গা পছন্দ ছিলো। আমারও ভালই লাগতো। কিছু দুষ্টু মিস্টি আবদার, মৃদু অভিমান আর একরাশ ভালবাসা নিয়ে কতশত কথা হতো আমাদের। একসাথে রিকশায় ঘুরতে যাওয়া, নদীর পাড়ে বসে কখনও জীবনানন্দ দাস আবার কখনও জসিমউদদীনের কবিতায় দুজনের প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া। আরও কত স্মৃতি। সত্যিই কত যত্ন করে আমাদের ভালবাসার স্মৃতিগুলো গল্প কবিতায় রঙ্গিন করে তুলেছিলাম আমরা। এতো ভালবাসা দিয়ে কেনো আমাকে অভ্যস্ত করে তুলেছিলে? আচ্ছা তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালবেসেছিলে? তোমার ভালবাসা এতো রহস্যে ঘেরা কেনো মেয়ে?

দিন গড়িয়ে চলে যায় সময়ের স্রোতে। জীবন থেমে থাকে না তবে থমকে যায় কিছু মামুষের ভালো থাকা। বেরিয়ে আসে খোলস ছেড়ে কাছের মানুষদের জন্য ভাল থাকার অভিনয়। অনেক সময় পেরিয়েছে। একটা চাকরী করছি এখন। বাবাকে এবার একটু বিশ্রাম দিতে চাই। তাদেরও অনেক ইচ্ছে পুরন করা বাকি যে৷ এবার তাদের দায়িত্ব তো নিতেই হয়।

এই ডায়রীর শেষ পৃষ্ঠা। তোমায় নিয়ে আর কিছু লিখার নেই আমার। রহস্যের সমাধান আমি করতে পারিনি। কিছু প্রশ্ন তোমার কাছে থেকেই গেলো। কে তুমি রহস্যময়ী? তবে জীবনের অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোর কাতারে তোমাকে রাখলাম। জানি, এসবের উত্তর জীবন আমাকে দেবে না। তবে কি জানো, তোমার আমার কখনও প্রেম ছিলো না। বাবা মার অনেক দিনের চোখের জল আর দেখতে পারছি না। কাল বিয়েটা করেই ফেলছি ওই দুটি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে। তোমার জন্য শেষবারের মতো আমার এই কিছু কথাই বলার-

এক গোধূলির মতো সময় নিয়ে একটিবার দেখতে এসো, চা নিয়ে অপেক্ষা করবো। চা খেতে জোর করবো না তবে ওই সময়ে আমার জমানো চিঠি গুলো নাহয় একটিবার দেখে এসো। এরপর নাহয় একটু ভালোবাসা অথবা একটু বিরক্তি নিয়ে দুটো মিনিট আমার পাশে বসে আমার চোখের দিকে চেয়ে থেকো। এরপরও যদি চলে যেতে চাও তবে যেতে পারো, বৃষ্টি থেমে গেলে আমি আর আটকাবো না।
— ভালো থেকো নওশিন।

ডায়রীটা বন্ধ করে চোখের পানি মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ইরা। মানুষ কি এমনও হতে পারে। মামুন আর ইরার বিয়ে অনেকটা জাঁকজমক ভাবেই হয়েছিলো। বিয়ের প্রথম দিন থেকেই ইরা দেখছে মামুন কেমন যেনো চুপচাপ। ইরার যা প্রয়োজন সবকিছুই দায়িত্বমতো করেছে মামুন শুধু তার মুখে এক চিলতে হাসি দেখেনি ইরা। কিছু মেকি হাসি ব্যতীত। একদিন যখন ইরা বললো,
আপনি আমায় বিয়ে করে খুশি না?”
“মামুন ওই মেকি হাসি হেসেই বললো,
‘খুশি না হলে কি একসাথে থাকতাম।’
তবে ইরা যখন একটু ঘনিষ্ঠ হতো তখন মামুন কেমন যেনো গুটিয়ে যেতো। ইরা বুঝতে পেরেছিলো তার আর মামুনের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। যেটা তাকে জানতেই হবে। তারপর একদিন রাতে এই চিলেকোঠায় ঢুকতে দেখলো মামুন কে। ব্যাস, তারপর তো মামুন অফিসে গেলেই আজ ইরা সবটা জানলো।

ইরা প্রথম থেকেই মামুনের অনেক খেয়াল রাখতো। অনেকবার একটু বসে খোসগল্প করার ইচ্ছে হয়েছিল ইরার। বলতে ইচ্ছে করছিল যে বিয়ের আগে ও দুটো প্রেম করেছে। একটা ছিলো সিনেমার নায়কের কপি আর একটা আদু ভাই। কিন্তু বলা হয় না। মামুন সামনে আসলেই পরিবেশ কেমন যেনো একটু ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। আজ ইরা বারান্দায় বসে আছে। একটু আগেই মামুন অফিস থেকে ফিরেছে। ইরাকে অনেকক্ষন সামনে না পেয়ে ভাবলো আজ কিছু হয়েছে কিনা তার৷ তাই বারান্দায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘আপনার কি কোন কারনে মন খারাপ? আমার কি কোন ভুল হয়েছে?’
ইরা কিছু বললো না। কেবল চোখটা মুছে সামনে তাকিয়ে থাকলো। মামুন ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেও কিছু বলতে পারলো না। কি যেনো এক অদৃশ্য বাধা। রাতে খাবার সময় মামুনের মা ইরাকে খেতে ডাকলে ও খিদে নেই বলে কাটিয়ে দিলো। মামুন নিজের মাঝে চিন্তায় পরে গেলো।

ছাদে এসে মামুন অনেক কিছুই ভাবছে। যাকে সে এখনও ভালবাসে সে তার অতীত বা বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ কিছুই নয়। সে শুধুই রহস্যময়ী তার কাছে। কিন্তু যে তার বর্তমান তাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছে সে? তারও তো ইচ্ছে নিজের স্বামীকে নিয়ে একটু স্বপ্ন দেখতে। সেও তো চায় তার স্বামী তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসুক। দায়িত্বশীল হলেই কি সেটা ভালবাসা হয়? একটু খানি নিজেদের মতো করে কি সময় কাটাতে ইচ্ছে হয় না তার? এসব ভাবতেই পেছনে ইরা এসে মামুন কে বললো,
“আপনাকে কিছু কথা বলার ছিলো?”
পেছনে তাকিয়ে ইরাকে দেখতেই মামুন হচকচিয়ে গেলো। বললো,
‘হ্যা বলুন কি বলবেন।’
ইরা একটু চুপ থেকে বললো,
“কাল আমি বাসায় চলে যাচ্ছি। কোন কারনে হয়তো আপনি এ বিয়েতে খুশি ছিলেন না। তাই আপনাকে আর কোন ধরনের সংকোচে ফেলতে চাই না। আমি আর আপনার বিরক্তির কারন হতে চাই না।”
মামুন কেমন যেনো চুপ হয়ে গেলো। কিছু বলছে না দেখে ইরা পেছনে ফিরে পা বাড়ালো।

মামুন তখন বললো,
‘একটু বসবেন আমার পাশে?’
ইরা যেনো একটু অবাক হলো। তবে দাঁড়িয়েই থাকলো। মামুন উঠে গিয়ে ইরাকে বেঞ্চে বসালো। বললো,
‘আমার জীবনে এমন কিছু সময় ছিলো যখন আমি খুব ভালো ছিলাম। কিন্তু হঠাৎই কোন এক কারনে আমি এরকম হয়ে যাই। নিজের মাঝেই যেনো নিরস আমি। কোন উৎফুল্লতা নেই। আসলে কাউকে নিজের জিবনে জরানোর কোন চিন্তাও ছিলো না। কিন্তু আমি ফিরে আসতে চাই আগের সময়ে। ফিরে পেতে চাই সেই সময়কে। কিন্তু এটার জন্যঔ যেই উপলক্ষ্য টা প্রয়োজন সেটা আমি পাই নি। মা বাবা ভেবেছিল বিয়ে হলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। তাদের দিকে তাকিয়ে বিয়েটাও করেছি। কিন্তু ওই সুন্দর সময় গুলো আমাকে এখনো বের হতে দিচ্ছে না। আমার কেনো যেনো মনে হয় আপনি সেই উপলক্ষ্য। পারবেন কি আমাকে এই বিষন্নতা থেকে বের করে আপনার নিজের রঙ্গে রাঙ্গাতে? আমিও ভালো থাকতে চাই আপনার সাথে। শুনবেন কি আমার সাথে কি হয়েছিলো?’

ইরা এতোক্ষনে মামুনের হাত ধরে ফেলেছে। দেখলো মামুনের চোখটা ছলছল করছে। এই মানুষটা এতোদিনের বিষন্নতা মনে পুষে রেখেছে কিভাবে সেটাই তো ও জানেনা। বললো,
“আমি জানি আপনার জিবনের ওই সময়টাকে। কেনো নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন? আপনি শুধু একটু ভরসা করুন আমার ওপর, আমি ঠিক আপনাকে সাজিয়ে নেবো।”

মামুন অবাক হয়ে আছে। সে জানে? ওর অবাক হওয়ার দিকে তাকিয়ে ইরা মাথা নেড়ে ওকে সম্মতি জানালো। হ্যা, সে জানে। হাতটা শক্ত করে ধরে বললো,
“আমি আপনার স্ত্রী। আপনার অর্ধাঙ্গিনী। আমাকে ভরসা না করলে হবে? এই যে আপনাকে ছুয়ে কথা দিচ্ছি, আমি হারিয়ে যাবো না। আর হারিয়ে গেলেও আপনাকে নিয়েই হারাবো। তবে বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে এই বিষন্নতা থেকে বের করবই।”

মামুন কিছু ভাবছে না। কেনো যেনো খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর। কেউ একজন তো পেয়েছে সে যাকে নিজের কষ্টটা বোঝাতে পেরেছে। পারলো না সে। ইরার হাতকে জড়িয়েই কেঁদে ফেললো সে। ইরার চোখেও কি একটু আদটু পানি গড়িয়ে পরছে? চোখের পানিটা মুছে ও মনে মনে বললো,
কোথাও যাচ্ছি না আমি। আজ কেঁদে নাও সাহেব। আর কাঁদতে পারবে না। তুমি মন খুলে কাঁদতে না পারলে পরে মন খুলে হাসবে কি করে?

এরপর আর ফিরে দেখতে হয় নি তাদের। ইরার হাজারও ব্যস্ততা যেনো মামুনকে ঘিরেই। আপনি স্তর থেকে বেরিয়ে তারা এখন তুমিতে এসেছে। টুকটাক বই ইরাও পড়তো। তাই মামুনের কাছে বায়না তার, রাতে বই পড়ে শোনাতে হবে। মামুন একটু ভেবে বলেছিলো,
‘এটা যে পুরনো অতীতকে মনে করিয়ে দেবে।’
ইরা বলেছিলো,
“অতীতকে ভুলে গেলেই তুমি তোমার অবস্থান ভুলে যাবে। অতীতকে পাশে নিয়েই বর্তমানকে রাঙ্গাতে হয়। আর আমরা চাইলেও অতীতকে ভুলতে পারি না। যেটুকু পারি তা হলো, অতীতকে ফেলে বর্তমানকে প্রাধান্য দেয়া। এবার বলো পড়ে শোনাবেনা বই? আমার কিন্তু সমরেশ পছন্দ।”

মামুন হেসেছিলো। একটু একটু বিশ্বাস করতে শুরু করেছে সে। আবার ভয়ও ছিলো যে ইরাও আবার হারিয়ে যাবে নাতো? তেমনিই একদিন অফিস থেকে ফিরে ইরাকে দেখলো না সে। ওকে না দেখতে পেয়েই তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। ইরার ফোনটাও দেখছে রুমেই পরে আছে। তবে কি ইরাও চলে গেলো? সহ্য হলো না যেনো মামুনের। টেবিলে কাচের ফুলদানি সহ আরও অনেক কিছুই আছড়ে ভাঙছে আর কাঁপছে সে। তখনি ইরা দৌড়ে আসলো। ইরাকে দেখতে পেয়ে মামুন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। মনে হলো অনেক মুল্যবান কিছু ফিরে পেয়েছে সে। ইরা ওকে জড়িয়ে দেখলো ওর শরীর কাঁপছে। ইরা চিন্তিত স্বরে বললো,
“এই কি হয়েছে তোমার? এভাবে কাঁপছো কেনো?”
মামুন আরও শক্ত করে ধরে বললো,
‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমিতো ভেবেছি তুমিও ওর মতো—আর কিছু না বলেই মামুন চুপ হয়ে গেলো।’
ইরা মামুনকে বিছানায় বসিয়ে ওর মুখ চোখ ওড়না দিয়ে মুছে দিলো। বললো,
“আমিতো পাশের বাসায় গিয়েছিলাম মা সহ। পাশের বাসায় ভাবির বাচ্চা হয়েছে তাই দেখতে গিয়েছি। আর এতেই তুমি কি না কি ভেবেছো। এইটুকুতে এতো পাগলামি কেউ করে?”
মামুন শান্ত হলো। আসলেই তো। আর এদিকে ইরা অনেক খুশি যে মামুন তাকে এতোটা নিজের করে নিয়েছে বলে। মজা করে ইরা বললো,
“এই তুমি কাঁদছিলে?”
‘না তো। এমনিই।’
“আমাকে ভালবাসবে তো এভাবে সারাজীবন?”

মামুন ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো,
‘এই তোমাকে পাশে সবসময় চাওয়াটা যদি ভালবাসা হয় তবে সারাটাজীবন এভাবেই ভালবাসবো। শুধু আমার পাশে থেকো এভাবে। কি থাকবেতো?’
ইরা যেনো ওকে আরও নিজের করে নিলো। মামুন এবার একটু দুষ্টুমি মুখে বললো,
‘আচ্ছা পাশের বাসার ভাবীর কি যেনো বললে, বাচ্চা হয়েছে তাই তো। আচ্ছা। এ বাড়িতেও অনেকদিন হলো বাচ্চা দেখি না। এবার একটা বাচ্চা নিয়ে নেই কি বলো?’
ইরা মুখ উঠিয়ে বললো, “হুম কিন্তু বাচ্চা কোথথেকে নিয়ে আসবে?”
মামুন ইরার দিকে মিটিমিটি হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকলে ইরা বুঝে যায় মামুন কি বলতে চাইছে। এটা বুঝতে পেরে ইরা দৌড়ে পালায় আর মামুন হেসে ফেলে। প্রানখোলা সেই হাসিটা।

কাল পহেলা বৈশাখ। ইরার খুব ইচ্ছে কাল দুজনি ওরা বৈশাখি সাজে সাজবে। কিন্তু মামুন এসব কিছুই হতে দিল না। বৈশাখের সাজে না সাজলেও ইরাকে নিয়ে রমনা বটমুল সহ অনেক জায়গায় ঘুরলো তারা। সকাল থেকে বৈশাখি সাজে সাজতে না পারার জন্য মুখ ভার করে থাকা ইরাও অনেকটা মজা করলো মামুনের সাথে। টিএসসির মোড়ে চা খেতেই দেখলো সামনে এক মেয়ে বৈশাখি সাজেও একগাদা বই নিয়ে একটি ছেলের সাথে বসে আছে। পাশ থেকে দেখেও মনে হলো মেয়েটা কেমন যেনো চেনা চেনা। আচ্ছা এটা নওশিন নয়তো? ইরা মামুনের দিকে তাকিয়ে ওই মেয়েটির দিকে তাকালো। ইরা বললো,
“তার মতো মনে হচ্ছে কি?”
মামুন ইরার কোথায় ওর দিকে তাকালে ইরা বললো,
“মেয়েটির কাছে গিয়ে দেখবে সে কিনা?”
মামুন উঠে দাড়ালো। একটু হাসলো। ইরার হাতটা শক্ত করে ধরে বাসার দিকে রওনা দিলো। বললো,
‘সে হয়তে নওশিন আবার নাও হতে পারে। তবে রহস্যময়ীকে আমি আর এভাবে দেখতে চাই না।’

পুরো শহরে হয়তো আন্দোলিত হচ্ছে বৈশাখের আমেজ। কিছু পাওয়া অথবা কিছু হারানোর হিসেব। আমি হারিয়েছি তবে পেয়েছিও। রহস্যময়ী তুমি নাহয় বন্দী হয়ে থাকলে আমার চিলেকোঠার ভাজে, আর আমি নাহয় একটু একটু করে ভালো থাকি আমার ইরাবতীর ভালবাসার কুটিরে…….

ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শান্ত।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.