আধুনিকতার নামে অবিভাবকদের অসচেতনতায় সমাজ ব্যবস্থার অঃপতন

১৬

মেহেদী হাসান সজীব, ডেস্ক রিপোর্টঃ শুরু করা যাক রাজধানীর উত্তরার মদ পার্টি করে ধর্ষণ ও নিহত হবার ঘটনা দিয়ে। কিছুদিন আগে রাজধানীর উত্তরার ‘ব্যাম্বু শট’ নামে রেস্তোরাঁয় পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে তিনজন ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। দু’জন আরেকটি প্রাইভেট বিশ্বদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত তাদের আরেক বান্ধবী উত্তরার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা শেষ করতে পারেন নি। উত্তরার ওই পার্টিতে অংশ নেওয়া পাঁচ বন্ধুর মধ্যে দু’জন এরই মধ্যে মারা গেছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের মৃত্যুর কারণ বিষাক্ত ও নকল মদ খাওয়া। ওই পার্টিতে অংশ নেওয়া চার শিক্ষার্থী এখন আইনের হেফাজতে।

পার্টিতে অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে চার তরুণ-তরুণী পরিবার-বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে আসছিলেন। তাদের উচ্ছন্নে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ মা-বাবার বিচ্ছিন্নতা। সন্তান কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিশছেন আবার কখন কোথায় রাত কাটাচ্ছেন- এরও খবর রাখতেন না স্বজনরা।

রিমান্ডে থাকা শিক্ষার্থীরা পুলিশকে বলছেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঢিলেঢালা বন্ধন ও মা-বাবার মধ্যে দূরত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার ছাপ তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। প্রাচুর্য থাকলেও পারিবারিক অনুশাসন ও সন্তানদের প্রতি মা-বাবার স্বাভাবিক যে ‘যত্ন’, সেটা থেকে বঞ্চিত ছিলেন তারা। এমন ঘটনায় জড়িয়ে সন্তান মারা যাওয়ার অনেক সময় পার হওয়ার পর পরিবার দুঃসহ সংবাদ পায়।

এর আগে গত ৭ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এক শিক্ষার্থী তার বন্ধুর বাসায় গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনায়ও হাসপাতালে যাওয়ার পর পরিবার জানতে পারে- সন্তান কোথায় কার বাসায় গিয়েছিল। এবার মোহাম্মদপুরের ঘটনায় যে তিন শিক্ষার্থীকে পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তারা হলেন- মর্তুজা রায়হান চৌধুরী, নুহাত আলম তাফসির ও ফারজানা জামান নেহা। এই তিন শিক্ষার্থীসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন পার্টিতে অংশ নিয়ে মারা যাওয়া এক ছাত্রীর বাবা। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, মদ পান করিয়ে ধর্ষণের পর তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। ওই মামলায় আরও দুই আসামি হলেন শাফায়াত জামিল বিশাল ও আরাফাত। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিশাল ঢাকার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আত্মসমর্পণ করে হলফনামা জমা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমি সেই অজ্ঞাতনামা আসামি। ওই পার্টিতে ছিলাম আমি। হালকা নাশতা করার পর মদ পান করি। অসুস্থবোধ করায় একাই বাসায় চলে যাই।’ আর পুলিশ অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লালবাগ এলাকার নবাবগঞ্জ রোডের বাসা থেকে নেহাকে গ্রেপ্তার করে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, উত্তরায় রেস্তোরাঁয় ওই পার্টির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন নেহা ও আরাফাত। মদ কেনা থেকে শুরু করে অন্যান্য খাবার আয়োজনের মূল খরচ তারা দু’জন বহন করেছিলেন। নেহা ও আরাফাত পুরোনো বন্ধু। এক সময় নেহা ও আরাফাতের পরিবার মনিপুরিপাড়ায় একই ভবনের আলাদা ফ্ল্যাটে থাকত। একই জায়গায় বসবাসের সূত্র ধরেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। নেহার মা-বাবার বৈবাহিক সম্পর্ক আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার বাবা পুরান ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। লালবাগে তিনি আলাদা থাকছেন। আর নেহা ও তার ছোট বোন তার মায়ের সঙ্গে মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। নেহা জানান, একজন আঙ্কেল তাদের পরিবারকে বর্তমানে দেখভাল করতেন। ব্যাম্বু শটে বিষাক্ত মদ গ্রহণ করেছিলেন আরাফাত। পার্টিতে অংশ নিয়ে মামলায় আসামি হওয়ার পর নেহাকে তার বাবা এসে নিয়ে যান। এর পর বাবার বাসা থেকেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

জানা গেছে, নেহা উত্তরার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা শেষ করেননি। বছর খানেক আগে এক লন্ডন প্রবাসীকে বিয়ে করেন নেহা। প্রায়ই নিয়মিত ঢাকায় বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে পার্টিতে অংশ নিয়ে আসছিলেন তিনি। ঢাকার প্রায় সব সিসাবারের পরিচিত মুখ তিনি। নেহার বন্ধু আরাফাতের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আরাফাতের মা বেঁচে নেই। আরাফাত দেদার টাকা ওড়াতেন। তার ওপর পরিবারের তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

এই মামলার আরেক আসামি তাফসির। তার মা-বাবার সম্পর্কের বন্ধনও ঢিলেঢালা। তাফসিরের মা সরকারি একটি দপ্তরে চাকরি করেন। বর্তমানে তার পোস্টিং ফরিদপুরে। ঢাকায় মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ে তাফসিরদের বাসা। তাফসির একাই ওই বাসায় থাকেন। মাঝেমধ্যে তার মা ফরিদপুর থেকে এসে মেয়ের কাছে থাকতেন। তাফসিরের বাবা আলাদা অন্য জায়গায় বসবাস করেন। গত ২৮ জানুয়ারি উত্তরার পার্টিতে অংশ নেওয়ার পর অসুস্থবোধ করলে মর্তুজা রায়হান চৌধুরী তার বান্ধবীকে তাফসিরের বাসায় নিয়ে যান। পার্টিতে না গেলেও তাফসির তার খালি বাসায় বন্ধু-বান্ধবীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং সেখানেই ঐ ছাত্রী শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে শারীরিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হলে ৩১ জানুয়ারী মৃত্যুবরন করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় পরিবারের গণ্ডির বাইরে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেও স্বজনরাও কেউ তাদের খোঁজ নেননি। কারণ তারা এমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত, দীর্ঘ সময় যোগাযোগ না থাকলেও পরিবারের সদস্যরা খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বা টান অনুভব করেন না। রায়হান ও তার বান্ধবী এবং তাফসির ধানমন্ডির একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, সমাজে কোনো ঘটনা ঘটলে তার নানা দিক থাকে। কেন তরুণ প্রজন্মের এমন পরিণতি, তার পেছনের কারণ বিশ্নেষণ করে দেখা দরকার। সন্তানের প্রতি পরিবারের মনোযোগ না বাড়ালে এমন করুণ পরিণতির দৃষ্টান্ত আরও দেখতে হবে।

মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মৃত্যুঞ্জয় দে সজল বলেন, উত্তরার পার্টিতে অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীর পরিবারে অর্থবিত্তের অভাব ছিল না। তারপরও কেন তাদের পারিবারিক বন্ধন আলগা ছিল? উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের দায় কোনো অংশে কম নয়। এ ঘটনা অন্যদের জন্য একটা শিক্ষণীয় হতে পারে।

তথ্যসূত্র-দৈনিক সমকাল এবং প্রতিবেদকের নিজস্ব বিশ্লেষণ।

50% LikesVS
50% Dislikes
Leave A Reply

Your email address will not be published.